রাজনৈতিক কোন্দল না কি ব্যক্তিগত বিরোধ?

কুষ্টিয়ায় বিএনপির উপর হামলা সংঘর্ষে উত্তাল শংকরদিয়া

এফএনএস (রাজ্জাক মাহমুদ রাজ; ইবি, কুষ্টিয়া) : | প্রকাশ: ১৩ মে, ২০২৫, ০৫:১৯ পিএম
কুষ্টিয়ায় বিএনপির উপর হামলা সংঘর্ষে উত্তাল শংকরদিয়া

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার গোস্বামী দুর্গাপুর ইউনিয়নের শংকরদিয়া গ্রামে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। রোববার (১১ মে) বিকেলে ইউনিয়ন বিএনপির প্যানেলের আয়োজিত সমাবেশকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষ ঘটে। 

এতে গুরুতর আহত হন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ডা. আলফাজ উদ্দিন।

পরবর্তীতে পাল্টা হামলায় পুড়ে যায় একটি গুদাম ও কয়েকটি বসতবাড়ি। বর্তমানে পুরো ইউনিয়নে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

দুই পক্ষের সংঘর্ষ: কে কার পক্ষে?

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেলে শংকরদিয়া হাই স্কুল মাঠে একযোগে সমাবেশ আহ্বান করে বিএনপির দুটি পক্ষ। এক প্যানেলের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান আলফাজ উদ্দিন ও আহাদ আলী, যারা কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহরাব হোসেনের অনুসারী। অপর পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান ইউপি সদস্য মাহবুল আলম, ডা. খবির উদ্দিন ও ডা. রাজ্জাক, যারা বর্তমানে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাকির হোসেন সরকারের অনুসারী।

বিকেল পাঁচটার দিকে মাহবুল-খবির প্যানেল মাঠে সমাবেশ শুরু করলে হঠাৎ আলফাজ প্যানেলের কর্মীরা সংগঠিত হয়ে বাজারের ভেতর দিয়ে মাঠে প্রবেশ করে হামলা চালায়। এতে আলফাজ উদ্দিন গুরুতর আহত হন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

প্রতিশোধ পরায়ণ হামলা ও অগ্নিসংযোগ:

ঘটনার কিছু সময় পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আলফাজ প্যানেলের অনুসারীরা প্রতিপক্ষ মাহবুল প্যানেলের গুদামঘর ও বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন নেভাতে গিয়ে আলমডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া সদর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বাধার সম্মুখীন হন। অভিযোগ রয়েছে-আলফাজ প্যানেলের কর্মীরা ফায়ার সার্ভিসের পাইপ কেটে দেয়, যাতে আগুন নেভানো সম্ভব না হয়।

বিএনপি কার্যালয়ে হামলা ও প্রতিবাদ সমাবেশ:

ঘটনার পরদিন সোমবার (১২ মে) বিকেলে শংকরদিয়া বাজারে ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে নেতারা অভিযোগ করেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগপন্থী ও বর্তমানে বিএনপিতে ঢ়ুকে পড়া ‘নব্য নেতা’রা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অতর্কিতে কার্যালয়ে হামলা চালান।

তাদের দাবি, শংকরদিয়া গ্রামের ইউপি সদস্য ও মৎস্যজীবী লীগ নেতা মাহবুল মেম্বার, আসাননগর গ্রামের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ নেতা হারুন, মাসুদ রানা ও যুবলীগ নেতা ‘ছোট লাল্টু’সহ আরও কয়েকজন হামলায় অংশ নেন। তাদের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল। আলফাজ উদ্দিনকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। 

এ সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি ভাংচুর করা হয়। অফিসের চেয়ার, টিনের বেড়াও কুপিয়ে তছনছ করা হয়।

বিএনপির অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশের অভিযোগ:

বিএনপি নেতারা দাবি করেন, ‘নব্য বিএনপি’ নামধারী একাংশ মূলত আওয়ামী লীগের লোক, যারা সুবিধা নিতে বিএনপিতে যোগ দিয়েছে। হামলাকারীদের কয়েকটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে মাহাবুর মেম্বারকে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতার সঙ্গে এবং নৌকা প্রতীকে প্রচার চালাতে দেখা গেছে।

কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতাদের প্রতিক্রিয়া:

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব জাহিদুল ইসলাম বিপ্লব বলেন, “আলফাজ ডাক্তার বিএনপির দুর্দিনে সব আন্দোলনে ছিলেন সামনে। এ ধরনের হামলা মেনে নেওয়া যায় না। আমরা আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি।”

কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ সোহরাব হোসেন বলেন, “দলের মধ্যে ‘মাই ম্যান’ তৈরি করতে গিয়ে আওয়ামী দোসরদের বিএনপিতে ঢ়ুকানো হচ্ছে-এটি অত্যন্ত ভয়াবহ প্রবণতা। এ ঘটনায় যারা জড়িত, আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেব।”

প্রশাসনের বক্তব্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা:

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মেহেদী হাসান বলেন, “প্রাথমিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ সহিংসতা ঘটেছে। সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং অগ্নিকাণ্ডে একটি গুদাম ও একটি বসতবাড়ি পুড়ে গেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।”

এলাকার পরিস্থিতি ও জনমত:

শংকরদিয়া ও গোস্বামী দুর্গাপুর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এলাকাবাসীর শঙ্কা, এই সহিংসতা আবারও বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। প্রশাসনের প্রতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে স্থানীয়রা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে