বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বারের নির্বাচনী এলাকা বরিশাল-১ (গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া) আসন। বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের কয়েকটি নির্বাচনে বিনাভোটে এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছিলেন। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ অনেকটা অনিশ্চিত।
তাই এবারের নির্বাচনে ভোটের হিসেব পুরোটাই ভিন্ন। ইতোমধ্যে পুরনো দুর্গ ফিরে পেতে মাঠে তৎপর রয়েছেন বিএনপির সম্ভ্রাব্য চারজন প্রার্থী। বিএনপির একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এ আসনে ভাগ বসাতে প্রায় ছয় মাস পূর্বে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। সর্বশেষ গত ২৩ জুন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী বাছাইয়ের জন্য এ আসনের দলটির নেতাকর্মীদের নিয়ে পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনী সমীকরণ বলছে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এখানে মূল লড়াই হবে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীর সাথে ইসলামীক দলের প্রার্থীদের।
নির্বাচনী পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ এ আসনে বিএনপি অশংগ্রহণ করেছিলো ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ওইসময় এ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েও মাত্র ১ হাজার ৩০৫ ভোট পেয়ে সাবেক সাংসদ জহির উদ্দিন স্বপন পরাজিত হয়েছিলেন। এরপূর্বে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে প্রথমবারের মতো বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান পেয়েছিলেন ৭০ হাজার ৯৬৯ ভোট।
আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর নিজ দলের এক নেতা তার মনোনয়নের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন। যেকারণে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনার মুল সময় তাকে (সোবহান) আদালতের বারান্দায় কাটাতে হয়েছে। পরবর্তীতে ভোটগ্রহনের মাত্র সাতদিন পূর্বে মনোনয়নের বৈধতা ফিরে পেয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমে প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে আবদুস সোবহান ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। কিন্তু নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় ওই নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহানকে পরাজিত হতে হয়েছে।
গৌরনদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহে আলম ফকির বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে বিজয়ী আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছিলো ৯৮ হাজার ২৪৫ ভোট। পাশাপাশি মাত্র সাতদিন নির্বাচনী মাঠে গণসংযোগ করে তৎকালীন সময়ের নতুন মুখের ধানের শীষ মার্কার প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান পেয়েছিলেন ৭০ হাজার ৯৬৯ ভোট। এছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও সাবেক সাংসদ জহির উদ্দিন স্বপন পেয়েছিলেন ২০৩ ভোট, অশোক গুপ্ত ৩৭১ ভোট, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী ১ হাজার ৫৮২ ভোট, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রার্থী পেয়েছিলেন ৪১৫ ভোট।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত ফ্যাসিষ্ট সরকারের সময়ে একাধিকবার হামলা, মামলা ও কারাভোগ করেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে মাঠে সরব উপস্থিত থেকে দলীয় কর্মসূচি পালন করে আসা ক্লিন ইমেজের কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ আসন থেকে বিএনপির সম্ভ্রাব্য প্রার্থী হিসেবে নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে সরব উপস্থিত থেকে কাজ করে আসছেন।
সূত্রমতে, বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হচ্ছে বরিশাল-১ আসনের আগৈলঝাড়া উপজেলায়। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে সবদলের প্রার্থীদের কাছে ওই উপজেলার ভোটাররাই হচ্ছেন সবচেয়ে বড় ফ্যাক্ট। যে কারণে আগৈলঝাড়ার সন্তান হিসেবে ইতোমধ্যে হিন্দু সম্প্রদায়ের অধিকাংশ ইউনিট থেকে শুরু করে সবধর্মের সাধারণ জনতা আনুষ্ঠানিকভাবে ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহানকে সমর্থন দিয়েছেন। এর বাহিরে বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় থেকে বিএনপির চরম দুর্দীনে ইঞ্জিনিয়ার আবদুস সোবহান গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় সেখানে (গৌরনদী) গড়ে তুলেছেন বিশাল ভোট ব্যাঙ্ক।
পাশাপাশি এ আসন থেকে বিএনপির সম্ভ্রাব্য প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্ধিতা করতে চান গৌরনদী উপজেলার বাসিন্দা তিনজন প্রার্থী। তারা হলেন-বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির বরিশাল বিভাগের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান এবং বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল।
বিএনপির চার নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী হওয়ায় এ আসনে প্রায় ছয়মাস পূর্বে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য হাফেজ মাওলানা কামরুল ইসলাম খান দলের মনোনীত প্রার্থী হওয়ায় নিয়মিত তিনি দলীয় কর্মকান্ডের পাশাপাশি নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী মাঠে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি (কামরুল ইসলাম খান) বলেছেন, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলে বরিশাল-১ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর বিজয় কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না। এ আসনে এখন পর্যন্ত এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদসহ অন্য কোনো দলের নেতার তৎপরতা দেখা যায়নি।