শিক্ষকদের দাবি না মানলে, নির্বাচনে দায়িত্ব পালন না করার হুঁশিয়ারি

এফএনএস (এ.কে. আজাদ সেন্টু; লালপুর, নাটোর) : | প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর, ২০২৫, ০৬:২২ পিএম
শিক্ষকদের দাবি না মানলে, নির্বাচনে দায়িত্ব পালন না করার হুঁশিয়ারি

নাটোরের লালপুরে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাতা, ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং কর্মচারীদের জন্য ৭৫ শতাংশ উৎসব ভাতাসহ তিন দফা দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। একই সঙ্গে ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর পুলিশের হামলা ও বলপ্রয়োগের নিন্দা সহ কেন্দ্রীয়ভাবে ঘোষিত লাগাতার কর্মসূচির প্রতি সংহতি জানিয়ে তারা বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারক লিপি প্রদান করেন।

রোববার (১৯ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ১১টায় উপজেলার বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা উপজেলা চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি গোপালপুর সিএনজি স্টেশন, রেলগেট ও নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলস এলাকা ঘুরে পুনরায় উপজেলা চত্বরে এসে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। শেষে উপজেলা নির্বাহী অফিসে দুপুর ১ টা ৩০ মিনিটে স্মারকলিপি প্রদান করেন।

বেসরকারি কলেজ শিক্ষক-কর্মচারীদের তিন দফা দাবি আদায় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যক্ষ ড. মো. ইসমত হোসেনের সভাপতিত্বে

গোপালপুর মহিলা আদর্শ ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ বেলাল হোসেন, গোপালপুর পৌর টেনিক্যাল এন্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ আকরাম হোসেন, মঞ্জিলপুকুর কৃষি কারিগরি ও বানিজ্যিক মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম, পাইকপাড়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মওলানা আবুল কালাম আজাদ, আখচাষী নেতা আনসার আলী দুলাল, ভেল্লাবাড়িয়া বাগুদেওয়ান আলীম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ জয়তুননেসা, অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, সহকারী শিক্ষক মঞ্জুরা খাতুন প্রমুখ।

এছাড়াও সমাবেশে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও শিক্ষক নেতারা বক্তব্য দেন।

বক্তারা বলেন, “শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। আর সেই মেরুদণ্ডকে দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছেন দেশের বেসরকারি এমপিও ভুক্ত  শিক্ষকরা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অবহেলায় তারা আজও বঞ্চিত।” তারা জানান, দেশের ৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়ন করছে, অথচ সেই শিক্ষকদের ন্যূনতম ভাতা ও সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না।

বক্তারা আরও বলেন, সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৪৫-৫০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, এমনকি লাঞ্চ, যাতায়াত ও বিনোদন ভাতাও পান। কিন্তু বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা দেশ ও সরকারের আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনা করে মাত্র ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা চেয়েছেন-তাও দেওয়া হচ্ছে না। এতে শিক্ষক সমাজ গভীরভাবে হতাশ ও মর্মাহত।

তারা অভিযোগ করেন, এনটিআরসি-এর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষক নিজ বাড়ি থেকে শত শত মাইল দূরে কর্মরত। মাসিক মাত্র ১২ হাজার ৫০০ টাকার বেতনের সঙ্গে ১ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়া ও ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা দিয়ে সংসার চালানো অসম্ভব। অথচ তাদের বেতন থেকেও ১০ শতাংশ কেটে রাখা হয়। বক্তাদের ভাষায়, “বাংলাদেশে কোথাও এক হাজার টাকায় ঘর ভাড়া বা ৫০০ টাকায় চিকিৎসা সম্ভব নয়।”

তারা বলেন, কর্তৃপক্ষকে বহুবার বিষয়টি অবহিত করা হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং অনাবশ্যক প্রশিক্ষণ ও প্রকল্পের নামে সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে, যার ৭০ শতাংশই কর্মকর্তাদের পেছনে ব্যয় হয়। শিক্ষক বা শিক্ষার্থীরা তাতে খুব একটা উপকৃত হন না। তাই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাতিল করে শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান তারা।

শিক্ষক নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “শিক্ষকদের প্রতি সরকারের এই বৈষম্য বন্ধ না হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা টেকসই হবে না। আমাদের দাবি ন্যায্য বাস্তবায়ন করতে হবে।”

তারা আরও বলেন, রাজপথ তাদের জায়গা নয়। তারা শ্রেণিকক্ষে ফিরে যেতে চান। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে কোনো দায়িত্ব পালন করবেন না বলে হুঁশিয়ারি দেন শিক্ষক নেতারা।

সমাবেশ শেষে শিক্ষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন।

উল্লেখ্য, গত ১৩ অক্টোবর থেকে সারাদেশের মতো লালপুরেও এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি পালন করছেন। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এর আগে ১২ অক্টোবর থেকে ঢাকায় অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। রাজধানীর শাহবাগ, প্রেস ক্লাব ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ হয়। পরদিন সারাদেশে ক্লাস বর্জন ও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।

১৪ অক্টোবর শিক্ষকরা ‘সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা’র ঘোষণা দেন এবং সরকারের প্রতি ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। পরবর্তী দিনগুলোতে জাতীয় প্রেস ক্লাব, শাহবাগ ও শহীদ মিনার এলাকায় গণসমাবেশ, সড়ক অবরোধ, অনশন ও কালো পতাকা ধারণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়।

অবশেষে আন্দোলনের অষ্টম দিনে, রোববার (১৯ অক্টোবর), সরকারের উপসচিব মিতু মরিয়মের স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে (সর্বনিম্ন ২ হাজার টাকা) বাড়ি ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত জানানো হয় যা ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হবে। তবে শিক্ষক-কর্মচারীরা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে