উত্তরের জেলা নওগাঁয় প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমজুরে চলে মাটিখেকোদের তান্ডব। তারা এলাকার ফসলী জমি, ভিটেমাটি কেটে একের পর এক পুকুর খনন করে সেই মাটি অন্যত্র বিক্রি করে। দুএকটি উপজেলায় প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করে। এতে বেকায়দায় পড়ে কাজের ধরণ পাল্টায় তারা। অসৎ ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে দিনের বেলা বাদ দিয়ে রাত ১১টা থেকে ভোর পর্যন্ত চালাচ্ছে এসব অপকর্ম। তাই এবার অত্যন্ত সাহসীকতার সাথে গভীর রাতেই তাদের ডেরায় হানা দিয়েছেন মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো: আরিফুজ্জামান।
মাটিখেকো চক্র এই উপজেলার রাইগাঁ ইউনিয়নের রঘুনাথপুরে মহাদেবপুর-মাতাজীহাট পাকা সড়ক সংলগ্নস্থানে দুইটি অবৈধ খননযন্ত্র ভেক্যু মেশিন বসিয়ে ভিটেমাটি, গাছগাছালী কেটে বিনষ্ট করে পুকুর খনন করছিল। সেখানকার মাটি বিক্রি করে অসংখ্য ড্রামযোগে পরিবহণ করছিল। এতে পাকাসড়কে মাটি পড়ে পিচ্ছিল হয়ে দূর্ঘটনার কারণ হয়। স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) সাংবাদিক কাজী সাঈদ টিটো ও সাংবাদিক সুমন কুমার বুলেট সরেজমিনে সেখানে গিয়ে জানতে পারেন ওইগ্রামের আলাউদ্দিন আলী পুকুরটি খনন করছেন। এজন্য কারো অনুমতি নেননি। মাটি কাটার ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি নিজেকে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির আত্মীয় ও ইউপি মেম্বারের ছেলে বলে দম্ভোক্তিও করেন।
সাংবাদিকেরা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আরিফুজ্জামানকে সাথে সাথেই জানােেল তিনি ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান। রোববার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে রাইগাঁ ইউনিয়ন উপ-সহকারি ভূমি কর্মকর্তা কল্লোল হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন ইউএনওকে রিপোর্ট দেন। এদিন দিবাগত রাত ১২টার দিকে ইউএনও তার নিজের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার সদস্য এপিসি আব্দুর রহমান, আনসার বদিউজ্জামান জনি, আনসার শরিফুল ইসলাম, আনসার আব্দুল্লাহ ও মহাদেবপুর থানার এসআই আব্দুল মতিনসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাহসী অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানে মাটি পরিবহণের কাজে ব্যবহৃত সাতটি ড্রাম ট্রাকসহ দুজনকে আটক করে নিয়ে আসেন। পরে ইউএনওর অফিস কক্ষে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এর ৪ (খ) ধারার বিধি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে সরকারি রাস্তার পাশে পুকুর খনন করে মাটি পরিবহণের দায়ে আটক রঘুনাথপুর গ্রামের মৃত আশরাফুল ইসলামের ছেলে সাজ্জাদ হোসেনের (৩৪) এক লক্ষ টাকা জরিমানা অনাদায়ে দুই মাস বিনাশ্রম কারাদন্ড ও নওগাঁ সদর উপজেলার কোমাইগাড়ী এলাকার হাবিল প্রামাণিকের ছেলে তাইজুল ইসলামের (৪২) ষাট হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেন। রাতেই তারা জরিমানার টাকা জমা দিয়ে ছাড়া পান। জব্দ করা ড্রাম ট্রাকগুলোও ছাড় করা হয়।
এর মাত্র এক সপ্তাহ আগে গত ২১ অক্টোবর পূর্বরাত ৩টায় আইন-শৃঙ্খলা বিশেষ বাহিনীর সহায়তায় ইউএনও উপজেলার সফাপুর ইউনিয়নের কদমতলী নামক স্থানে আত্রাই নদীর পার থেকে অবৈধভাবে বিট বালু উত্তোলনের সময় অভিযান পরিচালনা করে একটি ড্রাম ট্রাক ও তিনটি মোটরসাইকেল জব্দ এবং মতিউল্লাহ (২৮) ও মানিউল (২৫) নামে দুজনকে আটক করে থানায় নিয়ে আসেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাদের উভয়ের এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে তিন মাস করে বিনাশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেন। জরিমানার টাকা পরিশোধ না করায় বিকেলে তাদেরকে নওগাঁ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। জব্দ করা একটি ড্রাম ট্রাক ও তিনটি মোটরসাইকেল এখনও থানায় রয়েছে। এদের মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।
বালু ও মাটি খেকোদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে এই দুই অভিযান পরিচালনা করে এলাকার সাধারণ মানুষের প্রশংসায় ভাঁসছেন ইউএনও মো: আরিফুজ্জামান। গত পাঁচ বছরে এই উপজেলায় চারশ’র বেশি অবৈধ পুকুর খনন করা হলেও প্রশাসন এসব বন্ধে তাদের বিরুদ্ধে তেমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এবার শুষ্ক মৌসুমে এলাকায় আগের মত পুকুর খনন শুরু হলেও ইউএনওর শক্ত হস্তক্ষেপে মাটিখেকোরা শঙ্কায় পড়েছে। অচিরেই এসব পুরোপুরি বন্ধ হবে এই আশা স্থানীয়দের।