মাত্র ৩০ টাকার ভাড়াকে কেন্দ্র করে বাস শ্রমিক ও ছাত্রদের মধ্যে রণক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে বরিশালের পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পরেছে।
বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদে শিক্ষার্থী ও শ্রমিক সংঘর্ষের জেরধরে রোববার (১৬ নভেম্বর) সকাল থেকে বন্ধ রয়েছে সকল আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার পরিবহন চলাচল। ফলে চরম ভোগান্তিতে পরেছে এ রুটে চলাচলকরা যাত্রীরা।
জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে কয়েক দফায় সরকারি ব্রজমোহন কলেজ (বিএম) শিক্ষার্থীদের সাথে হাফভাড়া নিয়ে শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর এই উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দাবি, সংঘর্ষে প্রায় দুই শতাধিক বাস ভাঙচুর করা হয়েছে এবং দুটি বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এতে অন্তত ৩০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন।
অন্যদিকে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, গত বছর ১৮ আগস্ট মালিক সমিতির একটি অফিস আদেশে সরকারি ছুটির দিনসহ সর্বদা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফভাড়া নেয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু শনিবার বিকেলে হিজলা থেকে ছেড়ে আসা জোহান পরিবহন নামের বাসের সুপারভাইজার তা মানতে অস্বীকৃতি জানায়।
এ নিয়ে বাকবিতন্ডার একপর্যায়ে শ্রমিকরা তিনজন শিক্ষার্থীকে মারধর করেন। খবর পেয়ে ২০/২৫ জন শিক্ষার্থীরা নথুল্লাবাদ বাসটার্মিনালে এসে বিষয়টি বাস মালিক গ্রুপের সভাপতিকে অবহিত করেন।
এ সময় বাস মালিক গ্রুপের নেতাদের উস্কানিতে শ্রমিকরা শিক্ষার্থীদের ওপর অর্তকিতভাবে হামলা চালায়। এতে কমপক্ষে ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
তবে শ্রমিকরা জানিয়েছেন, হিজলা থেকে ছেড়ে আসা জোহান পরিবহনের চালক হিরন নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনালের কাছে ফিলিং স্টেশনে পৌঁছানোর পর আগেই সেখানে উপস্থিত থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে তাকে মারধর করে। এরপর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রায় সহস্রাধিক শিক্ষার্থী টার্মিনালের আশপাশে জড়ো হয়ে বাস ভাঙচুর শুরু করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সেখানে শতাধিক বাস ভাঙচুরের পাশাপাশি নূর পরিবহনসহ দুটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এদিকে শনিবারের ঘটনার জের ধরে রোববার সকাল থেকে বরিশাল নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার সব বাস চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে।
তবে বাস বন্ধের নির্দেশনা কার পক্ষ থেকে এসেছে, মালিক সমিতি নাকি শ্রমিক সংগঠন তা স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। শ্রমিক ইউনিয়ন সভাপতি শাহাদাত হোসেন লিটন বলেন, আমরা অনির্দিষ্টকালের জন্য গাড়ি চলাচল বন্ধ রেখেছি।
আমাদের যে গাড়িগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অর্ধশত শ্রমিক আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। একইসাথে পরবর্তীতে যেন এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয় তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এরপর গাড়ি চলাচল শুরু করা হবে। নথুল্লাবাদ বাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেন বলেন, শনিবারের নৈরাজ্যে দুইশ' বাস সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। একাধিক পরিবহন কাউন্টার ভাঙচুর করে লুটপাট করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এতো বড় ঘটনা ৪০ বছরে কখনও ঘটেনি। এমনকি মসজিদের ভেতরে আশ্রয় নেয়া শ্রমিকদেরকে মারধর করেছে শিক্ষার্থীরা। এ ঘটনায় প্রশাসন সুষ্ঠু বিচার না করা পর্যন্ত গাড়ি রাস্তায় নামবে না। প্রয়োজনে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাস চলাচল বন্ধ থাকবে।
এদিকে বরিশাল নগরীর রূপাতলী থেকে বাস চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে একটি সূত্র জানায়, নথুল্লাবাদের ঘটনা কেন্দ্র করে একাত্মতা প্রকাশ করে রূপাতলীতেও পরিবহন বন্ধের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
কিন্তু রূপাতলী বাস মালিক সমিতির সভাপতি জিয়াউদ্দিন সিকদার এই সম্ভাবনা নাকচ করে বলেন, নথুল্লাবাদের ঘটনার সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই; তাই রূপাতলী থেকে বাস চলাচলে বাঁধা তৈরি হবেনা।
জানা গেছে, মাত্র ৩০ টাকা ভাড়া কম দেয়াকে (হাফ ভাড়া) কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিরোধ এখন বরিশালের পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল করে দিয়েছে।
শিক্ষার্থী ও শ্রমিক উভয়পক্ষই নিজেদের ওপর হামলার অভিযোগ করছে। প্রশাসন এখনও সমাধানের কোনও উদ্যোগ ঘোষণা না করায় সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বরিশাল মেট্রােপলিটন এয়ারপোর্ট থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম বলেন, শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে।
পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেষ্টায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে এখনও কোনও পক্ষ থানায় অভিযোগ দায়ের করেননি। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং সহিংসতা এড়াতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।