জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের রায় সোমবার ঘোষণা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল পরদিনই রায়ের কপি পাঠানো হবে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদার অসুস্থ হয়ে পড়ায় মঙ্গলবার এই কপি আর পাঠানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে ট্রাইব্যুনাল প্রশাসন।
মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর যা ছিল মঙ্গলবার, দুপুরে ট্রাইব্যুনাল প্রশাসন জানায় যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি অফিস এবং কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা রাজসাক্ষী ও দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছেও আজ রায়ের কপি পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান অসুস্থ থাকায় এই প্রক্রিয়া স্থগিত করতে হচ্ছে।
এর আগের দিন সোমবার, ১৭ নভেম্বর যা ছিল সোমবার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল রায়ে শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যু পর্যন্ত ফাঁসির দণ্ড ঘোষণা করে। একই মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
রায়ের বিস্তারিত অংশে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করে যে হাত পা হারানো, মাথার খুলি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, নাক চোখ বিকৃত হওয়া অবস্থায় যে সব প্রত্যক্ষদর্শী আদালতে হাজির হয়েছিলেন, তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় অপরাধের ভয়াবহতা নিয়ে সন্দেহের কোনো সুযোগ নেই। আদালত বলে, “এ ধরনের অপরাধের বিচারে কোনো বিলম্ব বা ব্যত্যয় গ্রহণযোগ্য নয়।”
প্রথম অভিযোগে শেখ হাসিনাকে দায়ী করা হয় উসকানি, প্ররোচনা ও নির্যাতনে নিষ্ক্রিয় থাকার জন্য। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে যে গত বছরের ১৪ জুলাই গণভবনের সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত ছাত্র জনতাকে রাজাকার বলা এবং সেদিন রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ভিসি মাকসুদ কামালকে ফোন করে নির্যাতন ও দমন অভিযান চালানোর নির্দেশ দেওয়া সংঘটিত ঘটনার অংশ।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, জুলাই গণআন্দোলন দমনে হেলিকপ্টার ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। আদালতের বিবেচনায় এই নির্দেশনার পরিণতিতে ৫ আগস্ট চানখারপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা এবং একই দিনে আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে দেওয়া দুর্বৃত্তদের কর্মকাণ্ড ছিল সেই রাজনৈতিক নির্দেশনার অনুসরণ। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে আদালত তার একমাত্র দণ্ড অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।
একই অপরাধে আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। রাজসাক্ষী হিসেবে সম্পূর্ণ সত্য প্রকাশ করায় মামুনকে শাস্তিতে নমনীয়তা প্রদর্শন করে পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে।
এই মামলায় প্রসিকিউশন মোট পাঁচটি অভিযোগ তুলে ধরে। প্রথম অভিযোগ উসকানি, দ্বিতীয়টি আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ, তৃতীয়টি রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা, চতুর্থটি চানখারপুলে ছয়জনকে হত্যা এবং পঞ্চমটি আশুলিয়ায় ছয়জনকে হত্যা ও লাশ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা।
মঙ্গলবার রায়ের কপি পাঠানো না গেলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো জানিয়েছে, ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান সুস্থ হলে কপি পাঠানোর প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু করা হবে।