আপসহীনতার রাজনীতি ও দেশের প্রতি এক নিঃশর্ত ভালোবাসার নাম খালেদা জিয়া

ফারদিন রেদোয়ান | প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৭:০৪ পিএম
আপসহীনতার রাজনীতি ও দেশের প্রতি এক নিঃশর্ত ভালোবাসার নাম খালেদা জিয়া
ফারদিন রেদোয়ান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি নাম নন, তিনি একটি সময়, একটি ধারা এবং একটি রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক। তাঁর মৃত্যু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রস্থান নয়, বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান। যাঁরা তাঁকে ভালোবেসেছেন কিংবা যাঁরা তাঁর রাজনীতির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন, সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে তিনি ছিলেন আপসহীন রাজনীতির এক দৃঢ় প্রতীক।

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা সহজ ছিল না। তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির ভেতর দিয়ে। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র থেকে সহিংসতার মাধ্যমে তাঁর স্বামীকে হারানোর পর তিনি যে পথ বেছে নিয়েছিলেন, তা ছিল লড়াইয়ের পথ। সেই লড়াই ছিল স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এবং জনগণের ভোটের অধিকারের পক্ষে। এই পথচলায় তিনি কখনো আপসকে সহজ সমাধান হিসেবে নেননি। আপসহীনতা ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু।

নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তাঁর নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনিবার্য অধ্যায়। সামরিক শাসনের অবসান এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে ফেরার সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি শুধু ক্ষমতার রাজনীতি করেননি, বরং রাজপথের রাজনীতিতেও নিজেকে যুক্ত রেখেছেন। সেই সময় তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একটি শক্তিশালী গণআন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর শাসনামল নানা বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্য দিয়ে গেছে, এ সত্য অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সাংবিধানিক কাঠামো এবং বহুদলীয় ব্যবস্থার প্রশ্নে নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখেও দেশের স্বার্থের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রবণতা তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক।

বিরোধী দলে থাকাকালে তাঁর রাজনৈতিক জীবন আরও কঠিন হয়ে ওঠে। দীর্ঘ কারাবাস, অসুস্থতা, চিকিৎসা সংকট এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের মধ্যেও তিনি নিজের অবস্থান বদলাননি। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়েও তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রতীক হয়ে ছিলেন। এই প্রতীকী উপস্থিতিই তাঁকে বহু বছর ধরে একটি বড় রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে।

খালেদা জিয়ার রাজনীতির সবচেয়ে মানবিক দিক ছিল দেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর আবেগী সংযোগ। তিনি নিজেকে কখনো কেবল ক্ষমতাশীল শাসক হিসেবে নয়, বরং জনগণের একজন প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক ভাষা ও সিদ্ধান্তে দেশপ্রেমের অনুভব বারবার উঠে এসেছে। তাঁর কাছে বাংলাদেশ ছিল কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, ছিল আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন।

একই সঙ্গে তাঁর জীবন আমাদের রাজনীতির কিছু কঠিন সত্যও সামনে আনে। ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। খালেদা জিয়ার জীবন তাই শুধু স্মরণের বিষয় নয়, আত্মসমালোচনারও সুযোগ।

এই মুহূর্তে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে কেবল একজন নেত্রীকে স্মরণ করা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক যুগকে সম্মান জানানো। মতপার্থক্য থাকতেই পারে, ইতিহাস তার নিজস্ব পথে বিচার করবে। কিন্তু আপসহীনতা, সংগ্রাম এবং দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা দিয়ে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক জীবন শ্রদ্ধার দাবি রাখে।

খালেদা জিয়ার প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নেতৃত্ব ক্ষণস্থায়ী হলেও রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের দায় চিরস্থায়ী। সেই দায় নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের কাঁধে এখন আরও স্পষ্টভাবে এসে পড়েছে।

লেখক : ফারদিন রেদোয়ান