পঁচিশের প্রাপ্তি, ছাব্বিশের প্রত্যাশা

রাজু আহমেদ | প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৭:২১ পিএম
পঁচিশের প্রাপ্তি, ছাব্বিশের প্রত্যাশা
রাজু আহমেদ

বাংলাদেশের জন্য ২০২৫ সাল ছিল আত্মপরীক্ষার এক কঠিন বছর। বছরজুড়ে ঘটনাপ্রবাহ কেবল আমাদের সামনে বাস্তবতার ছবি তুলে ধরেনি; বরং একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে-আমরা কোন পথে হাঁটছি, কী মেনে নিচ্ছি, আর কীভাবে ধীরে ধীরে অস্বাভাবিককে স্বাভাবিক করে তুলছি। আন্দোলন, বিশৃঙ্খলা, আবেগ, প্রতিবাদ, নীরবতা ও মৃত্যুর মধ্য দিয়ে ‘২৫ সাল আমাদের শিখিয়েছে-সমস্যা কেবল ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনার নয়; সমস্যার বড়ো অংশ আমাদের সামষ্টিক আচরণ, মানসিকতা ও সংস্কৃতির গভীরেই প্রোথিত।

এই বছরের সবচেয়ে প্রবল ভাষা ছিল মৃত্যু। বাংলাদেশ হারিয়েছে এমন কয়েকজন মহীরুহকে, যাদের শূন্যতা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। দেশপ্রেমের প্রশ্নে, প্রতিবেশীর আধিপত্যবাদের বিরোধিতায় এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তারা আমৃত্যু আপোশহীন ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনা সারা দেশকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। দীপু দাসের হত্যা কিংবা মব জাস্টিসের শিকার নামহীন অসংখ্য মানুষ-এরা কেউই পরিসংখ্যান নয়; সবাই একেকটি সতর্কবার্তা।

বত্রিশ বছরের তরুণ ওসমান হাদির মৃত্যু আলাদা করে মনে দাগ কেটেছে। কারণ সে ক্ষমতার অংশ ছিল না, কোনো সুবিধাভোগী বলয়েরও নয়। তার একমাত্র পরিচয় ছিল নৈতিক অবস্থান। ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলা এবং আপোশ না করা-এই গুণগুলোই একসময় তার জন্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়। এই মৃত্যু আমাদের সতর্ক করে দেয়-আজকের সমাজে সৎ থাকা সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। হাদির জন্য মানুষের চোখের পানি, দোয়া ও ব্যথা প্রমাণ করেছে-সবকিছু সত্ত্বেও সমাজের বিবেক এখনো পুরোপুরি নিস্তেজ হয়নি। এটিই পঁচিশের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি।

এই বিবেকের পাশেই বড়ো প্রশ্ন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দীপু দাস হত্যার মতো নির্মম বাস্তবতা। এখানে কোনো বিস্ফোরণ বা বিদ্রোহ ছিল না; ছিল দীর্ঘদিনের ঈর্ষা, হিংসা ও নীরব প্রতিযোগিতা। সবচেয়ে ভয়ের সত্য হলো-এই ধরনের বিপর্যয়ের শিকড় বাইরের শত্রুতে নয়, বরং সবচেয়ে কাছের ছায়ায় লুকিয়ে থাকে। এই ঘটনা আমাদের শিখিয়েছে-সম্পর্ক ও সহমর্মিতার জায়গায় নৈতিকতা হারালে কর্মক্ষেত্রও ধীরে ধীরে অনিরাপদ হয়ে ওঠে।

২০২৫ সালের আরেকটি গভীর ক্ষত ছিল মব জাস্টিস। গুজব, সন্দেহ কিংবা আবেগের বশে বারবার মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা অফিসে আগুন দেওয়া রাষ্ট্র ও সমাজকে ভয়াবহ বার্তা দিয়েছে। এই কার্যকলাপে কেউ একা দায়ী নয়-এটি আমাদের সম্মিলিত অসচেতনতার প্রতিফলন। যখন যুক্তি হারিয়ে যায়, ধৈর্য ক্ষয়ে যায় এবং ধর্ম উগ্রতার কাছে জিম্মি হয়, তখন সভ্যতা দ্রুত পশুত্বের দিকে ঢলে পড়ে। এই প্রবণতা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছে-আইনের আগে দরকার মানবিক সংযম।

এইসব অস্থিরতার মধ্যেই বছরের একেবারে শেষে বিদায় নেন বাংলাদেশের প্রথম নারী ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী মহীয়সী বেগম খালেদা জিয়া। তার মৃত্যু ছিল একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। সাধারণ গৃহবধূ থেকে জননন্দিত, আপোশহীন নেত্রী হয়ে ওঠা এই মহীয়সীর প্রয়াণে সারা দেশের মানুষ তাকে স্মরণ করেছে সম্মানের সঙ্গে। তার বিদায় আমাদের শিখিয়েছে-সময় শেষ পর্যন্ত স্লোগানের নয়, স্মৃতির পক্ষ নেয়। রাজনৈতিক মতভিন্নতা যত তীব্রই হোক, মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে মানুষ এখনো এক জায়গায় দাঁড়াতে পারে।

পঁচিশের শেষপ্রান্তে দীর্ঘ সতেরো বছরের পরবাস শেষে দেশে ফেরেন জনাব তারেক রহমান। তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে নেতার প্রতি দেশবাসীর অন্যরকম এক ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে। এই ফেরা কেবল একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রত্যাবর্তন নয়; বরং দীর্ঘদিনের দূরত্ব ও বিভাজনের দেয়াল ভেঙে নতুনভাবে বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের প্রতীক। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিহিংসা দিয়ে নয়, অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণ দিয়েই শক্ত হয়-এই উপলব্ধি ২০২৫ সালে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়েছে।

বিদায়ি বছর রাজপথ ছিল আন্দোলনে ঠাসা। বিভিন্ন ইস্যু ও দাবিদাওয়া নিয়ে কর্মসূচি হয়েছে, কখনো কখনো যা নাগরিক জীবনকে ব্যাহত করেছে। আন্দোলন গণতান্ত্রিক চর্চার স্বাভাবিক অংশ; কিন্তু যখন বিশৃঙ্খলা উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। এই অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে-দাবি যত ন্যায্যই হোক, দায়িত্ববোধ ছাড়া তা টেকসই হয় না।

বছরজুড়েই অস্থিরতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রতিফলন দেখা গেছে শিক্ষাঙ্গণে। শিক্ষক হেনস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলার ভাঙন এবং সম্মানের সংকট ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিক্ষককে অপমান মানে কেবল একজন মানুষকে ছোট করা নয়; এটি একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ভিতকে দুর্বল করা। ‘২৫ আমাদের সতর্ক করেছে-নৈতিকতা ও শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া শিক্ষা কেবল সনদ উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়।

সারা বছরের টানাপোড়েনের মাঝেই ঘোষিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর এই ঘোষণা মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো জ্বালিয়েছে। নতুন বছরে ১২ ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে প্রত্যাশা-অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সমাজকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে নিতে পারে।

এই বাস্তবতা থেকেই ২০২৬ সালের প্রত্যাশা আরও স্পষ্ট ও দৃঢ়। আমরা চাই এমন একটি সমাজ, যেখানে প্রতিবাদ হবে যুক্তিনির্ভর, আন্দোলন হবে দায়িত্বশীল, আর মতভিন্নতা মানবিকতা কেড়ে নেবে না। শিক্ষাঙ্গণ হবে নিরাপদ, শিক্ষক হবেন সম্মানিত। সবচেয়ে বড়ো প্রত্যাশা-২০২৬ সালে আমরা নৈতিক সাহস ফিরিয়ে আনব। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলব, আবার উন্মত্ততাকেও স্পষ্টভাবে ‘না’ বলব। পঁচিশ আমাদের আয়না দেখিয়েছে। ছাব্বিশের চাওয়া একটাই-এই আয়নায় দেখা নিজেদের বদলানোর দৃঢ়তা।

লেখক: রাজু আহমেদ, প্রাবন্ধিক