বিশ্বকাপের মঞ্চে শিরোপা ধরে রাখার প্রস্তুতির মাঝেই বড় ধরনের অস্বস্তিতে পড়েছে আর্জেন্টিনা। কর ফাঁকি, অর্থপাচার ও ম্যাচ গড়াপেটার অভিযোগে দেশটির ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ কর্তাদের বিরুদ্ধে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়েছে। এই কেলেঙ্কারি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন লিওনেল মেসির দল আগামী বিশ্বকাপের আগে শেষ ধাপের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে বৃহস্পতিবার (১১ জুন)। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে বসতে যাওয়া এই আসরের আগে আর্জেন্টিনার সামনে রয়েছে আরও একটি বড় ম্যাচ। আগামী মার্চে ফিনালিসিমায় স্পেনের বিপক্ষে মাঠে নামার কথা আলবিসেলেস্তেদের। মাঠের প্রস্তুতির পাশাপাশি এখন প্রশাসনিক সংকটও সামলাতে হচ্ছে দলটিকে।
এই বিতর্কের সূত্রপাত ২০২৪ সালের মার্চে। আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ফুটবলার কার্লোস তেভেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও ও পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে তিনি বুয়েন্স আয়ার্সের শহরতলি পিলার এলাকায় এক রহস্যময় বাড়িকে ঘিরে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন। তেভেজের অভিযোগ, আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং ওই বাড়িতে টাকা ভর্তি ব্যাগ মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে একটি পুরনো ও মূল্যবান গাড়ির সংগ্রহ লুকিয়ে রাখার কথাও বলেন তিনি।
তেভেজের অভিযোগের পর প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল কোয়ালিসিওন সিভিকা বিষয়টি নিয়ে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করে। এরপরই শুরু হয় পুলিশি তদন্ত। তদন্তকারীরা জানায়, পিলারের ওই বাড়িটিই এএফএর আর্থিক অনিয়মের কেন্দ্র হতে পারে। রয়টার্স বলছে, এই তদন্তে শুধু এএফএ নয়, বেশ কয়েকটি ফুটবল ক্লাবও জড়িত থাকার তথ্য সামনে এসেছে।
ডিসেম্বরের শুরুতে আর্জেন্টিনার পুলিশ এএফএ সদর দপ্তরসহ এক ডজনের বেশি ফুটবল ক্লাব ও একটি আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায়। তিন দিন পর পিলারের সেই ভিলায় তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া যায় একটি হেলিপোর্ট, আস্তাবল এবং মোট ৫৪টি গাড়ি, যার মধ্যে ছিল বিলাসবহুল ফেরারি ও পোরশের মতো গাড়িও। কোয়ালিসিওন সিভিকার অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব সম্পত্তি এএফএ সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া ও কোষাধ্যক্ষ পাবলো তোভিগিনোর সঙ্গে জড়িত একটি অর্থপাচার চক্রের অংশ।
রয়টার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে আর্জেন্টিনার কর কর্তৃপক্ষও একটি মামলায় অভিযোগ এনেছে। সেখানে বলা হয়, একজন প্রসিকিউটর তাপিয়া, তোভিগিনো ও আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ১৩ মিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে রাখার অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে এএফএ কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এক বিবৃতিতে সংস্থাটি দাবি করেছে, তারা প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলাইয়ের সরকারের রাজনৈতিক চাপের শিকার।
এএফএর বক্তব্যে আরও বলা হয়, ২০১৭ সালে ক্লদিও তাপিয়া সভাপতি হওয়ার পর থেকে সংস্থাটি সঠিক পথেই এগিয়েছে। ২০২২ বিশ্বকাপসহ আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক সাফল্যের কথাও তুলে ধরে তারা জানায়, মাঠের অর্জনই তাদের অবস্থানের প্রমাণ।
তবে মাঠের সাফল্যের সঙ্গে প্রশাসনিক সংকটের এই দ্বন্দ্ব ফুটবলপ্রেমীদের ভাবিয়ে তুলেছে। আর্জেন্টিনার ক্রীড়া সাংবাদিক নেস্তর সেন্ট্রা রয়টার্সকে বলেন, “এখন আর্জেন্টিনায় যেন দুটি এএফএ রয়েছে। একটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সফল, আরেকটি দেশের ভেতরে গভীর অস্থিরতায় ভরা।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রভাব সরাসরি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অংশগ্রহণে পড়ার সম্ভাবনা কম। বুয়েন্স আয়ার্সের ক্রীড়া আইনজীবী অ্যালান ওয়াইল্ডার বলেন, “মেসিকে বিশ্বকাপ থেকে দূরে রাখার মতো সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য কেউই দিতে পারবে না। বিশেষ করে যদি সেটিই তার শেষ বিশ্বকাপ হয়ে থাকে।”
তারপরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। মাঠে মেসিরা যখন আর্জেন্টিনাকে আবারও শীর্ষে তুলতে লড়ছেন, তখন প্রশাসনিক দুর্নীতির ছায়া কি শেষ পর্যন্ত দলটির প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলবে না, সেই উদ্বেগ কাটছে না দেশটির ফুটবলপ্রেমীদের মন থেকে।