অনলাইন জুয়া-অনৈতিক কনটেন্টে বিপন্নযুবসমাজ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৫:১১ এএম
অনলাইন জুয়া-অনৈতিক কনটেন্টে বিপন্নযুবসমাজ

বাংলাদেশে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন জুয়া, পর্নোগ্রাফি এবং অনৈতিক বিজ্ঞাপনের বিস্তার এক ভয়াবহ সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা, গেমিং অ্যাপের ছদ্মবেশ এবং আন্তর্জাতিক জুয়া নেটওয়ার্কের প্রভাবে দেশের ছাত্র-যুবসমাজ এক অদৃশ্য বিপর্যয়ের মুখে। একদিকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঘটনা বাড়ছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় নৈতিক কাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার অনলাইন জুয়া ও অনৈতিক কনটেন্টের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে, তবে বাস্তবতায় তা কার্যকর করতে গিয়ে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে।একসময় জুয়া ছিল তাসের আসরে সীমাবদ্ধ। এখন তা স্মার্টফোনে, গেমিং অ্যাপে, স্পোর্টস বেটিংয়ে, এমনকি সাধারণ গেমের ছদ্মবেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। স্লট মেশিন, রুলেট, ব্ল্যাকজ্যাক, পোকার-সবই এখন অনলাইনে। ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিসসহ প্রতিটি খেলার প্রতিটি মুহূর্তে বাজি ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আইপিএল, বিপিএল, ইউরোপিয়ান লীগ- সবই জুয়ার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। এইসব অ্যাপের মাধ্যমে শিশু-কিশোররা বিনা পুঁজিতে ট্রায়াল খেলে, পরে উত্তেজনায় আসল টাকা বিনিয়োগ করে। অনেক অ্যাপে অ্যাকাউন্ট করলেই বোনাস দেওয়া হয়, যা দিয়ে সহজেই জুয়ায় প্রবেশ করা যায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন হয় দেশীয় এজেন্টদের মাধ্যমে, যারা হাজারে ৪০-৫০ টাকা কমিশন নেয়।সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সমপ্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, দেশের সাইবার স্পেসকে নিরাপদ, নৈতিক ও প্রজন্মবান্ধব রাখতে সরকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জুয়া, বেটিং ও পর্নোগ্রাফি সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন ও প্রোমোশনাল কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে, যা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর পরিপন্থী।সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের ধারা ২০(১) অনুযায়ী, সাইবার স্পেসে জুয়া বা বেটিং সম্পর্কিত কনটেন্ট তৈরি, পরিচালনা, প্রচার, বিজ্ঞাপন প্রকাশ বা উৎসাহ প্রদান দণ্ডনীয় অপরাধ। একইভাবে, ধারা ২৫(১) অনুযায়ী, পর্নোগ্রাফি বা অনৈতিক কনটেন্ট প্রচার, প্রচারে সহায়তা বা বিজ্ঞাপন প্রকাশও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এসব কার্যকলাপ তরুণ সমাজের নৈতিক বিকাশ, সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিক কাঠামোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।এই প্রেক্ষাপটে সরকার দেশের সকল সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টাল, টেলিভিশন চ্যানেল, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন সংস্থা এবং মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, তারা যেন তাদের প্ল্যাটফর্মে কোনোভাবেই জুয়া, গ্যাম্বলিং বা পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন প্রচার না করে। একইসাথে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, সেলিব্রিটি, ইনফ্লুয়েন্সার এবং কনটেন্ট নির্মাতাদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, তারা যেন এসব অনৈতিক পণ্য, সেবা বা ওয়েবসাইটের প্রচারে অংশগ্রহণ না করেন।সরকার মোবাইল কোম্পানি, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, গুগল অ্যাডসেন্স, মেটা অ্যাডসহ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্মগুলোকেও অনুরোধ জানিয়েছে, তারা যেন বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও নৈতিকতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞাপন প্রচার করে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ওয়েবসাইট, অ্যাপ ও নিউজ পোর্টালে ডিফল্ট বিজ্ঞাপন না চালিয়ে কাস্টমাইজড বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপনায় যেতে বলা হয়েছে, যাতে জুয়া, পর্ন বা গ্যাম্বলিং সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞাপন বা পপ-আপ না আসে।সরকার জানিয়েছে, জুয়ার বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে এবং আইন ভঙ্গ করলে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট বা অ্যাপের বিরুদ্ধে ব্লকিং, জরিমানা কিংবা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এই কার্যক্রম বাস্তবায়নে সিআইডি, বিটিআরসি, এনসিএসএ, এনটিএমসি, এনএসআই এবং বিএফআইইউ যৌথভাবে কাজ করছে।তবে বাস্তবতা বলছে, অনলাইন জুয়া বন্ধে সরকারের প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। কারণগুলো হলো-প্রযুক্তিগত চাতুরতা, আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের অভাব, অত্যধিক মুনাফা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, অসৎ কর্মকর্তা, মোবাইল অপারেটরের অসহযোগিতা, প্রলোভনমূলক অফার এবং সচেতনতার অভাব। একটি ওয়েবসাইট বন্ধ হলে সঙ্গে সঙ্গে নতুন লিংক চালু হয়। বিদেশি সাইটে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগ করা যায় না। অধিক মুনাফার কারণে এই ব্যবসা বন্ধে কেউ আন্তরিক নয়। রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত থাকায় আইনি পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মাসোহারা নিয়ে নিষ্ক্রিয়। মোবাইল অপারেটররা ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ায় জুয়া বন্ধে আগ্রহী নয়। মেসেজে ‘ফ্রি টাকা’ দিয়ে ব্যবহারকারীকে ফাঁদে ফেলা হয়। ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক শিক্ষা না থাকায় মানুষ জুয়ায় জড়িয়ে পড়ে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে প্রয়োজন বহুমুখী উদ্যোগ। ধর্মীয় অনুশাসন ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। জাতীয় কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ চালাতে হবে। কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাইট শনাক্ত ও বন্ধ করতে হবে। বৈশ্বিক সমন্বয় ছাড়া অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মোবাইল অপারেটরদের সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। কিশোর-যুবকদের মাঠে ফিরিয়ে আনতে হবে।সরকার মনে করে, একটি নৈতিক, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনে সরকারি সংস্থা, মিডিয়া, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। কেউ যদি অনলাইনে জুয়া, বেটিং বা পর্নোগ্রাফি সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞাপন বা কনটেন্ট দেখতে পান, তাহলে ৎবঢ়ড়ৎঃ@হংপধ.মড়া.নফ ঠিকানায় রিপোর্ট করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।