ধানের দেশ, গানের দেশ, পাখির দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অপরূপ প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার পাখি। পাখির রূপে মুগ্ধ হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। এ দেশের মানুষ পাখির ডাকে ঘুমিয়ে পড়ে আবার পাখির ডাকে জাগে। বিভিন্ন ঋতুতে বাংলাদেশে নানা রকম পাখি দেখা যায়। পাখিদের কোলাহল, কলরব, ডানা মেলে অবাধ বিচরণে সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রং-বেরঙের নানা প্রজাতির পাখির সৌন্দর্য দৃষ্টি কাড়ে মানুষের। কিন্তু নানা প্রতিকূলতায় প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে পাখির অনেক প্রজাতি।
পাখি এভিস শ্রেণির উষ্ণরক্তবিশিষ্ট, দেহ পালকে আবৃত এবং অগ্রপদ ডানায় রূপান্তরিত মেরুদণ্ডী প্রাণী। এদের মস্তিষ্ক অপেক্ষাকৃত বড়ো, দৃষ্টি তীক্ষ্ন ও শ্রবণশক্তি প্রখর, কিন্তু ঘ্রাণশক্তি কম। ভারী চোয়াল ও দাঁতের পরিবর্তে শক্ত চঞ্চু এবং ফাঁপা হাড় ও অন্যান্য অংশে বায়ুথলি থাকায় পাখির দেহের ওজন কম। প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে জুরাসিক সময়ে পাখিদের উৎপত্তি। পাখি পালক ও পাখাবিশিষ্ট দ্বিপদী মেরুদণ্ডী প্রাণী। এদের হৃৎপিন্ডের প্রকোষ্ঠ চারটি এবং এরা দন্তহীন প্রাণী। এদের পরিপাক ও রেচন প্রক্রিয়া তাদের সহজভাবে ওড়ার জন্য অনুকূল এবং অন্য সব প্রাণীদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত জীবাশ্ম নির্দেশ থেকে জানা যায় যে, প্রাথমিক পাখিদের আবির্ভাব হয়েছিল জুরাসিক যুগে শেষে, প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে। কিন্তু আসল পাখিদের বিবর্তন ঘটেছিল ক্রিটেশাস যুগে, প্রায় ১০ কোটি বছর আগে। জীবাশ্ম বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ৬ কোটি বছর আগের ক্রিটেশাস-প্যালিওজিন বিলুপ্তির পর পাখিরাই চার উপাঙ্গবিশিষ্ট ডাইনোসরের একমাত্র বংশধর। কারণ তখন সব প্রজাতির ডাইনোসরেরা বিলুপ্ত হয়েছিল কিন্তুু দক্ষিণ আমেরিকায় কিছু প্রজাতির পাখি ঐ ঘটনা থেকে বেঁচে গিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং বংশবৃদ্ধি করে। লিনিয়াসের নিয়ম অনুসারে পৃথিবীর সকল পাখির প্রজাতিকে এভিস শ্রেণির আওতাভুক্ত করা হয়েছে আবার জাতিজনি শ্রেণীবিন্যাসে এভিসকে ডাইনোসরের শাখা থেরোপোডায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরীসৃপ আর্কোসরিয়া ক্লেডের জীবিত বংশধর হচ্ছে এভিস এবং তাদের সহযোগী গোষ্ঠী। বিজ্ঞানীদের মতে এদের সামনের দুটি উপাঙ্গ বহু বছরের বিবর্তনে অভিযোজিত হয়ে ডানায় রূপান্তরিত হয়েছে। পাখিরা দক্ষ শিকারি এবং সর্বভুক, তাই তারা এ গ্রহের সবকটি মহাদেশে বিস্তৃতিলাভ করেছে।
বাংলাদেশে আমাদের চেনা-জানা পাখির সংখ্যা অনেক। দোয়েল, কোকিল, ময়না, টিয়া, কাক, পায়রা, চিল, ডাহুক, মাছরাঙা, পানকৌড়ি, কাকাতুয়া, বাবুই, কাঠঠোক্রা, চড়ুই, টুনটুনি, বুলবুলি, বউ কথা কও, শালিক, ঘুঘু, বক, বাংলা শকুন ইত্যাদি। এসব আমাদের খুব পরিচিত পাখি। এ দেশে কতরকম, কত ধরনের পাখি। পাখি অনেক রকমের রং-বেরঙের পাখি রয়েছে। এদের মধ্যে গানের পাখি, শিকারি পাখি, রাতের পাখি, ঝিল-পুকুরের পাখি, শীতের পাখি ও পোষা পাখি উল্লেখযোগ্য।
গানের পাখির মধ্যে অন্যতম দোয়েল। গরমের দিনে ঘরের পাশে, লেবুর ডালে, ডালিম শাখায় দোয়েল মনের সুখে গান করে। দোয়েলের মতো গানের গলা খুব কম পাখিরই আছে। শীতের সময় দোয়েল গান করে না। দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি। শীতের শেষে বসন্ত ঋতুর আগমনবার্তা নিয়ে আসে কোকিল। কোকিলকে তাই বলা হয় বসন্তের দূত। দেখতে কালো হলেও কোকিলের গানের গলা খুবই মিষ্টি। কোকিল কখনো মাটিতে নামে না। গানের পাখির মধ্যে সবচেয়ে ছোট টুনটুনি। দেখতে ছোট হলেও টুনটুনির গানের গলা বেশ মিষ্টি আর জোরালো। টুনটুনি বেশিক্ষণ উড়ে বেড়াতে পারে না। শ্যামা, বুলবুলি, বউ কথা কও এরাও খুব সুন্দর গানের পাখি।
শিকারি পাখি, মাছরাঙা, বাজপাখি, শকুন, চিল, বক ইত্যাদি। মাছরাঙা পুকুর পাড়ে মাটির গর্তে বাস করে আর সুযোগ বুঝে পানিতে টুপ করে ডুব দিয়ে ছোট মাছ ধরে খায়। বাজ আর চিল আকাশের অনেক উঁচুতে উড়ে বেড়ালেও দৃষ্টি থাকে নিচে। সুযোগমতো এরাও ছোঁ মেরে মুরগির ছানা ও অন্যান্য ছোট প্রাণী নিয়ে গাছের ডালে বসে খায়। বক দল বেঁধে আকাশে উড়ে বেড়ায়। আবার খাবার সময় হলে ঝিল-পুকুরের পাড়ে বসে মাছ ধরে খায়।
রাতের পাখি প্যাঁচা আর বাদুড়। এরা দিনের বেলা বের হয় না। প্যাঁচা বিভিন্ন পোকামাকড় ও ইঁদুর খেয়ে থাকে। বাদুড় গাছের ফল খায়। ঝিল-পুকুরের পাখি পানকৌড়ি, হাঁস, সারস, কোঁড়া। এরা ঝিল-পুকুরের পানিতে চরে বেড়ায় আর শামুক, ছোট মাছ ও জলের পোকামাকড় খেয়ে থাকে।
পোষা পাখি ময়না, টিয়া, কাকাতুয়া, শ্যামা, শালিক, ঘুঘু, পায়রা এসব পাখি ঘরে পোষা যায়। পোষা পাখির মধ্যে ময়না সবচেয়ে মজার পাখি। শিখিয়ে দিলে পোষা ময়না মানুষের মতো কথা বলতে পারে এবং মানুষের অনুকরণে নানা রকম শব্দ ও গান করতে পারে। ময়না কালো রঙের পাখি। তবে গলার কাছে একটি হলদে রেখা আছে। টিয়ে পাখির পালক হলদে শ্যামল, ঠোঁট লাল রঙের। শালিক, ঘুঘু ও কবুতর খুবই নিরীহ পাখি। মুরগি-হাঁস গৃহপালিত পাখি। এসব পাখি বাংলাদেশের প্রায় সব ঘরে দেখতে পাওয়া যায়। হাঁস ও মুরগির ডিম আমাদের খুবই প্রিয় খাবার।
কথাবলা পাখির গোটা বিশ্বে রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। কারণ এরা মানুষের কথাবার্তা হুবহু নকল করতে পারে। ভিমরাজ, ময়না, টিয়া,শালিক এসব পাখি বন্দী অবস্থায় এরা মানুষের কথা ছাড়াও বাচ্চার কান্না, থালাবাসনের শব্দ, কলিংবেলের শব্দ, বেড়ালের ডাক ইত্যাদি অবিকল অনুকরণ করতে পারে। তারা তীক্ষ্ন ও পরিষ্কার গলায় মানুষের মত শিষ দিতেও সক্ষম।
গ্রাম-গঞ্জে ফসলে কীটনাশক ব্যবহার পাখি বিলুপ্তির ক্ষেত্রে অনেকাংশেই দায়ী। কৃষকরা বিভিন্ন ফসলে সব সময় কীটনাশক ব্যবহার করেন। এতে পাখির খাদ্য ফড়িং, ফুতি, প্রজাপতি, মশা, লেদা পোকাসহ বিভিন্ন প্রকার কীটপতঙ্গ মারা যায় বা রোগে আক্রান্ত হয়। পাখি দিনের পর দিন এসব খেয়ে মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া শিকারিদের নিষ্ঠুরতা তো রয়েছেই। ফলে পাখির বিলুপ্তির কারণে যেমন জীবনচিত্রের সংকট বাড়ছে, তেমনি হারিয়ে ফেলছে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ।
১৭শ শতক থেকে আজ পর্যন্ত মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপে ১২০ থেকে ১৩০টি পাখি প্রজাতি পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। তারও আগে আরও একশটির মতো প্রজাতি একইভাবে বিলুপ্তি হয়েছে। পাখির অনেক প্রজাতির সংখ্যাই বিলুপ্তির পথে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ও পরিবেশ বিপর্যয় এর অন্যতম কারণ। গবেষণা থেকে জানা যায়, মানুষের নিষ্ঠুরতার শিকার হয়ে ১২ শতাংশের বেশি প্রজাতির পাখিই হয়ত আগামী দশকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। তাই এ ব্যাপারে জনসচেতনতা জোরালো করতেই ৫ জানুয়ারি পালিত হয় পাখি দিবস। কেবল মানব জাতির জীবের প্রতি দয়া, সহনশীলতা এবং সচেতনতাই রক্ষা করতে পারে পাখির স্বাভাবিক বেঁচে থাকা ও বংশ বিস্তারের পথ।
পাখি বাংলাদেশের প্রকৃতির এক মূল্যবান সম্পদ। শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও পাখির ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পাখিরা খাদ্যচক্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এরা পরিবেশ পরিষ্কারক। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভারসাম্য রক্ষায় পাখির ভূমিকা অনস্বীকার্য।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট