দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বলয় ও দলীয় প্রভাবের বাইরে গিয়ে এবারের নির্বাচনে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে প্রস্তুত কুড়িগ্রাম-৪ আসনের তরুণ ভোটাররা। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নদীভাঙন রোধকে প্রাধান্য দিয়ে তারা দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের কথা বলছেন। এতে বদলে যেতে পারে পুরো আসনের ভোটের হিসাব-নিকাশ।
জানাগেছে, নির্বাচন কমিশনের আপিল শুনানি শেষে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির প্রার্থী মোছা. শেফালী বেগমের মনোনয়ন বাতিল হওয়ায় প্রার্থীর সংখ্যা ৮ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭ জনে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বালতি প্রতীকে মো. রুকুনুজ্জামান, মো. আজিজুর রহমান ধানের শীষ প্রতীকে, মো. মোস্তাফিজুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে, মাওলানা হাফিজুর রহমান হাতপাখা, কে এম ফজলুল মন্ডল লাঙল প্রতীকে, মই প্রতীকে আব্দুল খালেক এবং কেচি প্রতীকে রাজু আহম্মেদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তথ্যানুযায়ী, ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জাতীয় পার্টির একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। তবে সময়ের ব্যবধানে দলটির সাংগঠনিক দুর্বলতা ও ইমেজ সংকটের কারণে সেই জনপ্রিয়তা বর্তমানে তলানিতে নেমে এসেছে। পরবর্তী সময়ে নবম থেকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত চারটি নির্বাচনের মধ্যে তিনবারই আওয়ামী লীগের প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে আওয়ামী লীগ শাসনামলে এসব নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক রয়ে গেছে। ফলে এবারের নির্বাচন ঘিরে ভোটের মাঠে ভিন্ন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠতে পারে তরুণ ভোটাররা। শিক্ষিত, সচেতন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এই ভোটাররা আর শুধু দলীয় পরিচয়ে ভোট দিতে আগ্রহী নন। তারা উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে চান। ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্ন ধরনের ফলাফল আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে।
রৌমারী উপজেলার তরুণ ভোটার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন,‘আমরা এবার দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দেব। যিনি উত্তরের এই পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের উন্নয়ন ও ভাগ্য পরিবর্তনে আন্তরিকভাবে কাজ করবেন, তার পক্ষেই আমাদের সমর্থন থাকবে।’
চিলমারী উপজেলার আরেক তরুণ ভোটার নুর ইসলাম বলেন,‘ভোট মানে শুধু দল নয়, ভবিষ্যৎ। আমাদের জীবনের সঙ্গে যারা বাস্তবভাবে যুক্ত হবে, কাজের মাধ্যমে বিশ্বাস তৈরি করবে, তরুণরা তাদেরই বেছে নেবে।’
সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের দেয়া তথ্যানুযায়ী কুড়িগ্রাম-৪ আসনে ১৮ থেকে ৩৭ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। যার বড় একটি অংশ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
এদিকে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দের পর মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক হিসাব বলছে, বিএনপি মনোনীত মো. আজিজুর রহমান ধানের শীষ প্রতীকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত মো. মোস্তাফিজুর রহমান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. রুকুনুজ্জামান বালতি প্রতীকের মধ্যেই আবর্তিত হচ্ছে ভোটের মূল লড়াই। প্রতিদিনের প্রচারণা, গণসংযোগ, কর্মী-সমর্থকদের তৎপরতা ও ভোটারদের প্রতিক্রিয়ায় অন্য প্রার্থীরা ধীরে ধীরে আলোচনার বাইরে চলে যাচ্ছেন।
২৮ কুড়িগ্রাম-৪ আসনটি চিলমারী, রৌমারী ও রাজিবপুর-এই তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত। এবারের নির্বাচনে রৌমারী উপজেলা থেকেই একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ফলে একই এলাকার ভোট বিভক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে চিলমারী উপজেলা থেকে একক প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করায় সেখানে ভিন্ন এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে আঞ্চলিকতা, দলীয় পরিচয় এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার পাশাপাশি তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক নাহিদ হাসান বলেন,‘এই নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা শুধু সংখ্যা নয়, তারা এখন দৃষ্টিভঙ্গি বদলের শক্তি। দলীয় আবেগের চেয়ে কাজ, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে তারা। যারা তরুণদের এই ভাষা বুঝতে পারবে না, তাদের জন্য ভোটের মাঠে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে।’