বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বিভিন্ন স্থানে দলের নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়া নারী কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ করে বলেছেন, একটি বন্ধু সংগঠন একদিকে দিচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, অন্যদিকে দিচ্ছে মায়েদের গায়ে হাত। তিনি তাদেরকে নিজের মাকে সম্মান করতে উপদেশ দেন। বলেন, এখনই মাথা গরম করেন না। গায়ে হাত আর পিঠে চাবুক মারলে সম্মান নিতে পারবেন না। ফ্যাসিবাদের দু:শাসনে ফিরে যেতে না চাইলে নতুন করে লড়াই করতে হবে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) দুপুর ২টায় খুলনা মহানগরী ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে সার্কিট হাউজ মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
কালো হাত আর সামনে বাড়ালে সমান হিসাব ফিরিয়ে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করতে আসলে আর ছেড়ে দেওয়া হবে না। তিনি ভোটাদের ভোট কেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহবান জানান। একইসঙ্গে তিনি নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ সবার জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ উপহার দিতে আগামী নির্বাচনে দাড়িপাল্লাসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী করার আহবান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদেরকে একটি ফ্যাসিবাদী শক্তির কবল থেকে ২০২৪'র ৫ আগষ্ট মুক্তিদান করেছেন। তিনি ২০২৬ সালে পল্টনের লগি- বৈঠার হত্যাকাণ্ড এবং ২৪'র জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভুতি প্রকাশ করেন।
জামায়াত আমির বলেন, চাকরির জন্য মামু- খালুর টেলিফোন আমাদের কাছে অচল। যোগ্যদেরকে উপযুক্ত স্থানে বসানো হবে।
তিনি বিগত সাড়ে ১৫ বছরের নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ফ্যাসিবাদী আমলে জামায়াতে ইসলামী সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দলের নিবন্ধন পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছিল, এমনকি দল নিষিদ্ধও করা হয়। সেই সময় দেশবাসী আমাদের আশ্রয় দিয়েছে। এজন্য আমরা মা ও ভাইদের কাছে ঋণী।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আজকে এখানে জামায়াতের পক্ষে কথা বলার জন্য দাঁড়াইনি। দাঁড়িয়েছি সাড়ে ১৫ বছর ধরে যারা হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের পক্ষে কথা বলতে, ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে কথা বলতে।
তিনি বলেন, ব্যাংক, বীমা ও শেয়ার মার্কেট লুট করে ২৮৪ জন মানুষকে আত্মাহুতির পথে ঠেলে দেওয়া হয়। ফলে দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া এবং জাফলং থেকে সুন্দরবনসহ সব এলাকার মানুষ ২৪'র গণঅভ্যুত্থানে রাস্তায় নেমে এসেছিলো। সেই ফ্যাসিবাদের দু:শাসনে ফিরে যেতে না চাইলে নতুন ভাবে লড়াই করতে হবে।
তিনি ২৪ পরবর্তী প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলেন, আমরা চাঁদাবাজি করিনি, প্রতিশোধ নেয়নি। কাউকে হয়রানি করিনি, কষ্ট দেয়নি। সব ধর্মের লোকদের নিরাপত্তা দিয়ে আমরা কথা রেখেছি। কিন্তু বন্ধু রাজনৈতিক দলগুলো কথা রাখতে পারিনি। বর্তমানে তাদের অনেকেই ফ্যাসিবাদের পুরানো অ্যাপ্রোন গায়ে দিতে চান বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ডা. শফিকুর রহমান যুবকদের হাতে বেকার ভাতার পরিবর্তে মর্যাদার সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সম্মানিত করা হবে বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশে মা-বোনেরা মর্যাদা ও নিরাপত্তা পাবেন বলে তিনি নিশ্চয়তা দেন।
ডা. শফিকুর রহমান খুলনার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলেন, খুলনা এক সময় কলকারখানা ও কৃষিতে উর্বর ছিলো। খুলনাকে শিল্পের রাজধানী বলা হতো। কিন্তু এখন তা নেই। একে একে সব শিল্প বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, দুনিয়ার সবদেশে শিল্প কলকারখানা বৃদ্ধি পেলেও খুলনায় কমে গেছে। আল্লাহর রহমতে এবং জনগণের রায়ে দেশের খেদমতের দায়িত্ব পেলে এ অঞ্চালের মানুষের সঙ্গে কথা বলে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করা হবে, জনগণের সম্পদ লুন্ঠন করা হবে না।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির মরহুম মতিউর রহমান নিজামী শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শিল্প প্রতিষ্ঠান চালু রাখার যে কাজ শুরু করেছিলেন জামায়াত ক্ষমতায় গেলে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি বলেন, কলকারখানা বন্ধ হওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়েছে। তাদের পরিবারও বিপদের মধ্যে পড়েছে। এসব বন্ধ প্রতিষ্ঠান চালু সহ নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
জনসভার শেষ দিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান শ্লোগান দেন' হ্যাঁ মানে আজাদী, না মানে গোলামী, প্রথম হ্যাঁ, এরপর ভোট ইনসাফের পক্ষে'। শেষে তিনি খুলনার ৫ টি আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা এবং একটি আসনের খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থীর হাতে দেওয়াল ঘঁড়ি প্রতীক তুলে দেন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহানগরী আমীর খুলনা-৩ আসনের জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ও নির্বাচনী জনসভা প্রস্তুতি কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে জনসভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, খুলনা-৬ আসনে জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, খুলনা-৪ আসনে খেলাফত মজলিস মনোনীত দেওয়াল ঘড়ির প্রার্থী খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, খুলনা-২ আসনে জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী খুলনা মহানগরী সেক্রেটারি এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল, খুলনা-১ আসনের জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী খুলনা জেলা হিন্দু মহাজোটের সভাপতি বাবু কৃষ্ণ নন্দী।
বক্তৃতা করেন ও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মাস্টার শফিকুল আলম, খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, মহানগরী নায়েবে আমীর অধ্যাপক নজিবুর রহমান, জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা গোলাম সরোয়ার, অধ্যক্ষ মাওলানা কবিরুল ইসলাম, জেলা সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-এর প্রেসিডিয়াম সদস্য ও খুলনা বিভাগীয় প্রধান সমন্বয়ক নিজাম উদ্দিন অমিত, এনসিপির খুলনা জেলা আহ্বায়ক মো. মাহমুদুল হাসান ফয়জুল্লাহ, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আবু বক্কার সিদ্দিক মোড়ল, লেবার পার্টির প্রতিনিধি মো. সাইফুদ্দোহা, সহ-সভাপতি অধ্যাপক মুফতি আব্দুল কাইয়ুম জমাদ্দার, খেলাফত মজলিস খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মাওলানা আব্দুল্লাহ যোবায়ের, খুলনা জেলা সভাপতি মাওলানা এমদাদুল হক, খেলাফত মজলিসের খুলনা মহানগর সভাপতি এফ এম হারুন অর রশীদ, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির খুলনা মহানগর সভাপতি এডভোকেট হানিফ উদ্দীন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মো. ইব্রাহিম খলিল, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য মো. জাকির হোসেন খান, মহানগরী জামায়াতের সহকারী এডভোকেট শাহ আলম, প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও আজিজুল ইসলাম ফারাজী, জেলা সহকারী সেক্রেটারি মুন্সি মঈনুল ইসলাম, এডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান, অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস ও অধ্যক্ষ গাওসুল আযম হাদী, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদ সদস্য খুলনা মহানগরী সভাপতি আরাফাত হোসেন মিলন, খুলনা জেলা উত্তরের সভাপতি ইউসুফ ফকির, দক্ষিণ জেলা সভাপতি আবু জার গিফারীসহ ১১ দলের কেন্দ্রীয়, মহানগরী ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। খুলনার কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক এর পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে জনসভার কার্যক্রম শুরু হয়। জনসভার শুরুতে ইসলামী সংগীত পরিবেশন প্রেরণা সাহিত্য সংসদ ও টাইফুন শিল্পী গোষ্ট্রী।