ভাটা পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি শনাক্ত

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৭:৫৮ এএম
ভাটা পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি শনাক্ত

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) সারাদেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম-দুর্নীতি তদারক করে। এমনকি ওসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম ও জাল সনদ শনাক্ত করার দায়িত্বও ডিআইএ পালন করে। বর্তমানে দেশে বর্তমানে প্রায় ৩৯ হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ডিআইএ সংশ্লিষ্টদের গা-ছাড়া ভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তদারকিতে ভাটা পড়েছে। কারণ ডিআইএর অধিকাংশ কর্মকর্তারা বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে না গিয়ে সময় কাটাচ্ছেন অফিসে খোশগল্প করে। ফলে গত এক বছরে অর্ধেকে নেমে এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সংখ্যা। আর মাঝে মধ্যে পরিদর্শনে গেলেও একশ্রেণির কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণ করে, অনিয়ম নেই বলে রিপোর্ট দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে দেশের এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে প্রায় ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এমপিওভুক্ত ও স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করতে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিআইএ। দপ্তরটিতে কর্মরত আছেন একজন পরিচালক ও যুগ্ম-পরিচালক, ৪ জন উপ-পরিচালক, ১২ জন পরিদর্শক ও ১২ জন সহকারী পরিদর্শকসহ মোট ৩০ কর্মকর্তা। তাছাড়া অডিট দপ্তর থেকে ৪ জন অডিট অফিসার এবং নিজস্ব জনবল থেকে ৯ জন অডিটর দায়িত্ব পালন করে। অভিযোগ উঠেছে তাদের মধ্যে কিছু কর্মকর্তার নেতৃত্বে ডিআইএতে শক্তিশালী ঘুষ সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। ওই সিন্ডিকেট সদস্যরা মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা সম্পন্ন করে অফিসে বসেই। অভিযোগ রয়েছে, ডিআইএর কর্মকর্তারা অফিসের কাজ না করে সারা দিন ব্যাচমেটদের সঙ্গে আড্ডা, তদবির, পদোন্নতি, পদায়ন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আর ওই কারণেই ভাটা পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি শনাক্ত। 

সূত্র জানায়, ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে ডিআইএ কর্মকর্তারা খুবই কৌসুলি। বিগত ২০১৭ সালে ঘুষসহ একজন শিক্ষা পরিদর্শক দুদকের হাতে গ্রেফতার হয়। তারপর থেকেই কর্মকর্তারা ঘুষ নেওয়ার ধরন বদলে ফেলে। বর্তমানে অডিট শুরু পর প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের সঙ্গে রেস্ট হাউজ বা অন্য গোপন স্থানে ঘুষের রেট ঠিক করে কর্মকর্তারা ঢাকায় চলে আসে। তার আগে প্রতিষ্ঠানে গিয়ে প্রথমে নিয়োগসহ অন্য প্রশাসনিক দুর্বলতার কথা বলে শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে। প্রতিষ্ঠান প্রধানের মাধ্যমে তাদের বার্তা দেন প্রকৃত অডিট হলে বহু শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগে জটিলতা ধরা পড়বে, বেতন বন্ধ হবে, এমনকি চাকরিও চলে যেতে পারে। শিক্ষকরাও ঝামেলা এড়াতে ঘুষ দিতে রাজি হন। বিশেষ করে অধ্যক্ষরা প্রতিষ্ঠানের নানা ধরনের আর্থিক দুর্নীতিতে যুক্ত থাকায় নিজে বাঁচতে ঘুষের টাকা সংগ্রহ করেন দেয়। তারপর ওই টাকা ঢাকা বা আশপাশের কোনো অজ্ঞাত স্থান থেকে তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে নেয়া হয়। পাশাপাীশ ডিআইএ থেকে দেয়া হয়েছে কঠোর বার্তা। তাতে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, পরিদর্শন ও নিরীক্ষার নামে যদি কেউ কোনো প্রকার টাকা সংগ্রহ করে তাহলে অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সংখ্যা কমলেও সঠিকভাবে প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট দফতরের দাবি। আর তার ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ডিআইএ কর্মকর্তাদের এই পরিদর্শন মিনিস্ট্রি অডিট নামে পরিচিত।

সূত্র আরো জানায়, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কারণ ডিআইএর একাধিক শিক্ষা পরিদর্শক ও সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শনে গিয়ে নিরীক্ষার নামে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার মধ্যে এক সহকারী শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা হয়েছে। আরেক শিক্ষা পরিদর্শকের বিরুদ্ধে পরিদর্শনে গিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার বাইরে ডিআইএর আরো কয়েক কর্মকর্তা ও অডিট কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময় নিরীক্ষার নামে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। 

এদিকে এ প্রসঙ্গে ডিআইএ’র একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত এক বছরে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে ৪০০র বেশি জাল ও ভুয়া সনদ চিহ্নিতকরণ, প্রায় ৩০০র বেশি অগ্রহণযোগ্য সনদ চিহ্নিত ও ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ প্রদান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাত হওয়া ৭৯৩ একর জমি উদ্ধারে সুপারিশ প্রদান, ভুয়া নিয়োগ, অর্থ আত্মসাৎ এবং ভ্যাট ও আইটিসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রায় ২৫৩ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ দেয়া হয়েছে।