বৈশ্বিক বাজারে তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং আমদানি-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা জাতীয় অর্থনীতিকে বারবার চাপের মুখে ফেলছে। শিল্পখাত থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা পর্যন্ত এর প্রভাব স্পষ্ট। এই পরিস্থিতিতে দেশজ উৎসে বিদ্যুৎ-জ্বালানি উৎপাদন নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। জানা গেছে, এই পরিকল্পনায় দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, নতুন কূপ খনন, পুরনো কূপ সংস্কার এবং উৎপাদন বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম জোরদার করার উদ্যোগ রয়েছে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭টি নতুন কূপ খননের মাধ্যমে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। আমরা মনে করি, এই উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও বাস্তবায়নে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। অতীতে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে ধীরগতি, নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কারে অনীহা এবং পরিকল্পনার অভাব আমাদের আমদানি-নির্ভর করে তুলেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি অর্থনীতিকে নাজুক করে তুলছে। তাই দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনুসন্ধান জোরদার করা এবং নতুন সম্ভাবনাময় ব্লকগুলো দ্রুত ইজারা দিয়ে উৎপাদন বাড়ানো অপরিহার্য। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও আমাদের সম্ভাবনা রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বায়োগ্যাস এবং জলবিদ্যুৎকে কাজে লাগাতে হবে। গ্রামীণ এলাকায় সৌরবিদ্যুতের বিস্তার ইতোমধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন প্রয়োজন বৃহৎ পরিসরে সৌরপার্ক স্থাপন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিনিয়োগ বাড়ানো। উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ুশক্তি ও পার্বত্য অঞ্চলে ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বৈচিত্র্য আসবে। নগর এলাকায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগও পরিবেশবান্ধব সমাধান হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নীতিগত ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতা। দ্রুত উৎপাদনের নামে উচ্চমূল্যের ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র স্থাপন না করে দেশীয় সম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে আত্মনির্ভরতা অর্জন শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তাই নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের পথও সুগম করবে। আমদানি-নির্ভরতা কমিয়ে দেশজ উৎসে বিদ্যুৎ-জ্বালানি উৎপাদনই হোক আগামীর বাংলাদেশের অঙ্গীকার।