রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার মধ্যে যোগাযোগ সহজ করতে তুরাগ নদের ওপর ‘প্রত্যাশা সেতু’ নির্মাণের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ছিল। দ্রুত নগরায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই সেতু লাখো মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতে স্বস্তি আনার কথা ছিল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্পটি এখন স্থবির হয়ে আছে। প্রায় ৪৯৮ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পর তিন বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পরও প্রকল্প থেমে আছে। আদালতের স্থিতাবস্থার নির্দেশের কারণে বাকি অংশের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে জনগণের প্রত্যাশা অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে গেছে। এই স্থবিরতার মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ভূমি অধিগ্রহণে অব্যবস্থাপনা। জমির মালিকদের অভিযোগ-প্রাথমিক পর্যায়ে যথাযথ ক্ষতিপূরণ বা স্বচ্ছ যোগাযোগ নিশ্চিত করা হয়নি। বরং আশ্বাস দিয়ে কাজ শুরু করা হলেও পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বাধ্য হয়ে তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জমির মূল্য পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে যে ফাঁক, সেটিই প্রকল্প বাস্তবায়নের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ একটি সংবেদনশীল বিষয়। এখানে স্বচ্ছতা, সময়মতো ক্ষতিপূরণ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সামান্য গাফিলতিও বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে, যার খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। ‘প্রত্যাশা সেতু’র ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটেছে। এদিকে, বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত পুরোনো বেইলি ব্রিজটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রতিদিন লাখো মানুষ আতঙ্ক নিয়ে এটি ব্যবহার করছে। যে কোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও বাস্তবসম্মত কোনো অস্থায়ী সমাধানও চোখে পড়ছে না। এটি কেবল অবকাঠামোগত ব্যর্থতা নয়; বরং জননিরাপত্তার প্রশ্নও। প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবও স্পষ্ট। এলজিইডি, জেলা প্রশাসন এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দায়িত্ব ও জবাবদিহির সীমারেখা স্পষ্ট না থাকায় সমস্যার দ্রুত সমাধান হচ্ছে না। প্রকল্প এলাকায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য উচ্চ পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়াও প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। ‘প্রত্যাশা সেতু’ শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাই দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে এই প্রকল্প থমকে থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে কাজ পুনরায় শুরু করাই এখন সময়ের দাবি।