ভোর হতেই সূর্যের উত্তাপ জানান দিচ্ছে দিনটি কতটা অসহনীয় হতে চলেছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাতক্ষীরার আকাশ যেন আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। গত তিন দিন ধরে তীব্র দাবদাহে দিশেহারা হয়ে পড়েছে জেলাটির জনজীবন। গাছপালা ঝিমিয়ে পড়ছে, মাঠঘাট ফেটে চৌচির, আর মানুষ ও প্রাণিকুল হাঁসফাঁস করছে একটু স্বস্তির খোঁজে। একদিকে অসহনীয় গরম, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের দোসর-সব মিলিয়ে জনজীবন এখন এক প্রকার স্থবির হয়ে পড়েছে।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিন ধরে সাতক্ষীরার তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ডিগ্রি বেশি। শুক্রবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা পৌঁছেছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। শনিবার আকাশ কিছুটা মেঘলা থাকলেও তাপমাত্রার পারদ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে অবস্থান করছে। এর ওপর বাতাসের আর্দ্রতা কম থাকায় গরমের তীব্রতা অনুভব হচ্ছে আরও বেশি। বিশেষ করে দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ছে। খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। যারা বের হতে বাধ্য হচ্ছেন, তারা তীব্র রোদ আর ধুলোবালি থেকে বাঁচতে ছাতা, হ্যাট বা স্কার্ফ ব্যবহার করছেন।
সাতক্ষীরা শহরের নিউ মার্কেট এলাকায় কথা হয় ভ্যানচালক রফিকুল ইসলামের সাথে। পেশার তাগিদে এই তীব্র রোদেও রাস্তায় বের হতে হয়েছে তাকে। তিনি জানান, "গত তিন দিন ধরে ভ্যান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। শরীর দিয়ে ঘাম বের হচ্ছে না, শুধু জ্বালাপোড়া করছে। দুপুরের দিকে রাস্তা দিয়ে তাকালে মনে হয় রাস্তা থেকে ধোঁয়া উঠছে। এই সময়ে এমন গরম গত কয়েক বছরে খুব একটা দেখা যায়নি।"
সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের উচ্চমান সহকারী জুলফিকার আলি রিপন বলেন, শুক্রবার বিকাল ৩টায় তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার দুপুর আড়াইটায় তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রির একটু বেশি। এ অবস্থা আরও দুই-একদিন থাকতে পারে। এদিকে তীব্র গরমের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে হিটস্ট্রোকের ভয়ে বা গরমে অসুস্থ হয়ে আসা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি ও তরল খাবার খাওয়ার জন্য।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. আব্দুর রহমান জানান, গত তিন দিনে প্রচুর সংখ্যক মানুষ জ্বর, মাথাব্যথা, পানিশূন্যতা এবং হিট-ক্র্যাম্পের সমস্যা নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, "তীব্র দাবদাহের সময় বাইরের কাজ এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো। যদি বাইরে বের হতেই হয়, তবে ছাতা ব্যবহার করুন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করুন। স্যালাইন বা ডাবের পানি পান করাও শরীরের জন্য এখন খুবই প্রয়োজন।" দাবদাহের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি খাত। সাতক্ষীরার মাঠগুলোতে এখন ধান পাকার সময়। দিনের বেলা শ্রমিকরা মাঠে কাজ করতে পারছেন না। মাঠের মাটি শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছে, যার ফলে সেচ ব্যবস্থা সচল রাখা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। আমের মুকুল ও গুটির ওপরও এই তাপপ্রবাহের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
বাগানিরা বলছেন, তাপমাত্রা যদি আরও কয়েক দিন এমন থাকে এবং ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হয় তবে আমের বড় ধরনের ক্ষতি হবে। গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত পানি পৌঁছাতে না পারলে ফলের আকার ছোট হয়ে যেতে পারে এবং ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাবে। শুধু মানুষ নয়, গৃহপালিত পশু ও পাখিরাও এই দাবদাহ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ছায়াঘেরা জায়গার সন্ধানে প্রাণীরা ছোটাছুটি করছে। গবাদি পশুর খামারিরা জানিয়েছেন, গরমে গরুর দুধ উৎপাদন কমে গেছে। তাদের শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে খামারিরা সারাদিন ফ্যান চালানো বা গবাদি পশুকে পানি দিয়ে ধুয়ে দেওয়ার মতো বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন।
প্রকৃতি যেন বৃষ্টির জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। খাল-বিল, পুকুর ও নদীগুলোর পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় চারপাশের গাছপালা মলিন হয়ে গেছে। সবুজের ওপর ধূসর আস্তরণ জমেছে যেন। তবে আশার কথা হলো, আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৬ এপ্রিল থেকে কিছুটা স্বস্তির বাতাস বইতে পারে। সেদিন বিক্ষিপ্তভাবে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা এই দীর্ঘ দাবদাহের অবসান ঘটাতে পারে। তীব্র গরমে শহরের কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানি ও শরবত বিতরণ করতে দেখা গেছে। অসহনীয় এই পরিস্থিতিতে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ কিছুটা হলেও স্বস্তি দিচ্ছে পথচারীদের। তবুও, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে নাগরিক জনজীবন এখন এক ধরনের ক্লান্তিতে ডুবে আছে। প্রকৃতির এই রুদ্রমূর্তি মানুষের সীমাবদ্ধতাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছ লাগানো ও সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। বর্তমানে সাতক্ষীরার বাসিন্দারা এখন কেবলই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, এক পশলা বৃষ্টির প্রতীক্ষায়। বৃষ্টির কোমল স্পর্শে পৃথিবী আবার সজীব হয়ে উঠবে-এই কামনাই এখন সাতক্ষীরাবাসীর কণ্ঠে। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগকে সতর্ক অবস্থানে থাকার আহ্বান জানিয়েছে সচেতন মহল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষও সাধারণ মানুষকে রোদের তীব্রতা থেকে সতর্ক থাকতে নিয়মিত নির্দেশনা প্রচার করছে। আশা করা যায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে এবং জনজীবনে স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে আসবে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। তাপমাত্রা কিছুটা কমলেও গরমের তীব্রতা বজায় থাকবে। পরবর্তী ২-৩ দিনের মধ্যে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া দিনের বেলা বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন।