অনৈতিক প্রস্তাবে নারীকে বাসায় ডেকে আনার পর টাকা নিয়ে বিরোধ হয়, আর সেই বিরোধের জের ধরে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে- শেরপুরের শ্রীবরদীতে সংঘটিত ডলি আক্তার হত্যা মামলার চাঞ্চল্যকর এই তথ্য মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই উদঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনায় জড়িত প্রধান আসামি ও তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে; তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। শনিবার পিবিআই জানিয়েছে, বুধবার সকালে শ্রীবরদী পৌরসভার তাঁতিহাটি পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী পাকা সড়কের পাশে একটি বড় ট্রাংকের ভেতর তালাবদ্ধ অবস্থায় তোশক দিয়ে মোড়ানো, হাত-পা বাঁধা এক অজ্ঞাতনামা নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পিবিআইয়ের জামালপুর জেলার একটি চৌকস দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় দ্রুত ওই নারীর পরিচয় শনাক্ত করে।
নিহত ওই নারী নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মো. আলাল মিয়ার মেয়ে মোছা. ডলি আক্তার। খবর পেয়ে তার ভাই মো. শফিকুল ইসলাম শ্রীবরদী থানায় এসে মরদেহ শনাক্ত করেন এবং অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, ডলি আক্তারের প্রায় ১৬ বছর আগে নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানার এলাকার কাজিম উদ্দিনের সঙ্গে বিয়ে হয়। এর বেশ কয়েক বছর পর কাজিম মারা যান। তিন বছর আগে মো. বিল্লাল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে আবারও বিয়ে করেন ডলি আক্তার। বিয়ের পর থেকেই ডলি ভালুকা থানাধীন স্কয়ার মাস্টারবাড়ী আইডিয়াল মোড় পয়েন্ট এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে পিএএনটি সোয়েটার কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সেখানে তার দুই ভাইও চাকরি করেন। তারা পাশাপাশি এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসাবে বসবাস করেন। হত্যা মামলাটি পিবিআইয়ের জামালপুর শাখা তদন্তভার গ্রহণ করে। তদন্তের একপর্যায়ে ৩ এপ্রিল লাশ পরিবহনে ব্যবহৃত একটি নীল রঙের পিকআপ ভ্যান শনাক্ত করা হয়। পরে শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ভেলুয়া ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে গাড়িটি জব্দ করা হয় এবং চালক মো. আশরাফ আলীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। আশরাফের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও শেরপুরে একাধিক অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় প্রধান আসামি মো. নিয়ামুর নাহিদ ও তার স্ত্রী রিক্তা মনিকে ৪ এপ্রিল ভোরে শেরপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভাতশালা এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে যাত্রীবাহী বাস থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, গাজীপুরের শ্রীপুরে ভাড়া বাসায় বসবাসকারী নাহিদ টেক্সটাইল কারখানায় চাকরি করতেন। গত ৩০ মার্চ রাতে তিনি তাৎক্ষণিক পরিচয়ের সূত্র ধরে ডলি আক্তারকে বাসায় নিয়ে যান, যেখানে তার স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন না। সেখানে তাদের মধ্যে টাকা-পয়সা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে ডলি আক্তার চিৎকার করলে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে নাহিদ তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। ঘটনার পর রাতে স্ত্রী রিক্তা মনিকে বাসায় এনে পুরো বিষয়টি জানানো হয়। পরে তারা দুজন মিলে হত্যাকাণ্ড গোপন করতে একটি বড় ট্রাংক কিনে লাশটি হাত-পা বেঁধে তোশক দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় ভরে রাখেন। পরদিন পিকআপ ভাড়া করে ট্রাংকটি শেরপুরের শ্রীবরদীর খরুলিয়া এলাকায় ফেলে রেখে গাজীপুরে ফিরে যান। পিবিআইয়ের জামালপুর জেলার পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত জানান, ঘটনার পরপরই একাধিক টিম গঠন করে অভিযান চালানো হয় এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়। টিমগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই স্বল্প সময়ের মধ্যে মামলার রহস্য উদঘাটন সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে হাজির করা হলে তারা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। আদালত তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পিবিআই।