সাতক্ষীরায় শিশুদের মধ্যে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ছোঁয়াচে রোগ হামের সংক্রমণ। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদানে ঘাটতি ও অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। শনিবার (৪ এপ্রিল) একদিনেই জেলায় ১৩ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, যা ওই দিন খুলনা বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলায় ২৯ জন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ইতোমধ্যে জেলা থেকে ৪০ জনের নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে একজনের শরীরে হাম ও একজনের শরীরে রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ ঘুরে দেখা যায়, শিশুদের ভিড় বাড়ছে। পৌর এলাকার অভিভাবক উম্মে সালমা জানান, তার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া মেয়ের প্রথমে জ্বর ও শরীর ব্যথার পর শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। একই উপসর্গের বর্ণনা দিয়ে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার কোমরপুর গ্রামের সোহরাব হোসেন জানান, তার মেয়ে স্থানীয় একটি গার্লস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। বর্তমানে মেয়েটি ফাউলপক্সে আক্রান্ত হয়েছে। সে এখন বাড়িতে চিকিৎসাধীন। একইভাবে আশাশুনির সুব্রত জানান, তার ছেলের অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর হাম শনাক্ত হয়। বর্তমানে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে সে সুস্থ রয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিসার রুহুল আমিন জানিয়েছেন, বর্তমানে কোনো শিক্ষার্থীর হাম বা গুরুতর অসুস্থতার খবর না থাকলেও, অনেক শিক্ষার্থীর বাড়িতে ছোট ভাইবোনদের সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আলমগীর কবীর জানান, জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলবসন্ত রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আক্রান্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানকে এ বিষয়ে আগেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রাত্যহিক সমাবেশে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে জোরদার করা হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সমন্বয়ে বিদ্যালয়ের আঙিনায় সপ্তাহে অন্তত দুইদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সাতক্ষীরা সরকারি শিশু হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. শামছুর রহমান বলেন, "হাম অত্যন্ত সংক্রামক। তীব্র জ্বর, কাশি ও চোখ লাল হওয়া এর প্রাথমিক লক্ষণ। অনেক শিশু নিয়মিত টিকাদান (ইপিআই) কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ায় বা টিকার দ্বিতীয় ডোজ না নেওয়ায় তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়নি। অপুষ্টি ও ভিটামিন 'এ'-র অভাবও সংক্রমণের অন্যতম কারণ।" সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. রিয়াদ হাসান জানান, আক্রান্ত শিশুদের উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসার পাশাপাশি ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হচ্ছে। জটিল রোগীদের জন্য আইসোলেশন ও বিশেষ ওয়ার্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।জেলা সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম জানান, জেলায় ৩২৬ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১২৫ জন। এই বিপুল জনবল সংকট নিয়েই স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে রোগী শনাক্ত ও সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করছেন। জেলা মেডিকেল অফিসার (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. জয়ন্ত সরকার জানান, শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক। সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, প্রান্তিক পর্যায়ে দ্রুত টিকাদান ক্যাম্পেইন ও উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সচেতনতা না বাড়ালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে। চিকিৎসকরা অভিভাবকদের কোনো প্রকার গুজবে কান না দিয়ে সরাসরি নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসার পরামর্শ দিয়েছেন।