খুলনার আদালতের রায় অমান্য করে এবং সরকারি কাজে বাধা প্রদান করে মব সৃষ্টির অভিযোগ উঠেছে রূপসার নৈহাটী ইউনিয়নের সামছুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ ম্যানেজিং কমিটির কয়েকজনের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বেলা আনুমানিক সাড়ে ১১ টায় রূপসা উপজেলার নৈহাটী ইউনিয়নের সামছুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে এ ঘটনাটি ঘটে।
ওই সময় দখলের কাজে জমিতে ব্যবহারিত টানানো লাল নিশানা ও প্যানা শিক্ষকদের প্রচরণায় শিক্ষার্থীরা মব সৃষ্টি করে ছিড়ে ফেলে ও সীমানার নিশানা উত্তোলন করে বাসের খুঁটি ভাংচুর করে। এননকি ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, বাদী পক্ষের আইনজীবী, সার্ভে কমিশন, জারিকারক, বাদী পক্ষসহ এলাকার বিভিন্ন স্তরের লোকজনের উপস্তিতিতে অশোভন আচারণ করেছে এমন অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এছাড়া ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বাদীর রায়কৃত জমি ২ এপ্রিল বাদী পক্ষদের দখল বুঝিয়ে দিতে গেলে শিক্ষকদের বার বার অনুরোধ করা সত্বেও তাদের দখল কাজে সহায়তা করেনি ওই প্রধান শিক্ষক সহ স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং দখলকাজ ব্যাহত হওয়ায় ম্যাজিস্ট্রেট এবং রূপসার সহকারী কমিশনার (ভুমি) এসিল্যান্ড, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, আদালতের আইনজীবী সহ অন্যান্যরা নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ঘটনাস্থল থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রূপদাস রায় বলেন, আদালতের রায় অমান্য করে স্কুলের প্রধান শিক্ষক হায়দার আলীসহ শিক্ষার্থী ও কিছু ছাত্র নামধারী বহিরাগত উশৃংখল লোকদের লেলিয়ে দিয়ে আমাদের সামনে মব সৃষ্টি করে। যেটা রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা প্রদান করে আইনকে অমান্য করেছেন। এটা অত্যন্ত দু:খজনক। আমি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। অনুসন্ধানী ও মামলার সুত্রে জানা গেছে, খুলনা জেলাধীন রূপসা উপজেলার নিকলাপুর এলাকার বাসিন্দা সামছুর রহমান জীবিত থাকাকালীন তার ১ একর ৭৫ শতক জমির মধ্যে এক একর জমি ১৯৯৮ সালে সামছুর রহমান তার নিজ নামীয় জমি সামছুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নামে দানপত্তন করেন। পরে সামছুর রহমান জীবিত থাকাকালীন ৭৫ শতক জমি তার নিজ নামে অবশিষ্ট থাকে। তার মৃত্যুর পর দীর্ঘ ১৪ বছর ভোগ দখলে থাকা অবস্থায় সামছুর রহমানের ওয়ারেশগণ ২০১১-২০১২ সালে ৭০ শতক জমি রূপসার নৈহাটী ইউনিয়নের বাগমারা এলাকার আলহাজ্ব শাহজাহান শেখের কাছে বিক্রি করে। যেটি স্কুলের দানকৃত জমি থেকে শাহাজাহান শেখের ৭০ শতক জমি সম্পূর্ণ আলাদা।
শাহাজাহান শেখের ক্রয়কৃত এই ৭০ শতক জমি স্কুল কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক দফায় দফায় দখল করতে গেলে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়। এমনকি ২০১২ সালের ২৬ নভেম্বর তিনি বাদী হয়ে সামছুর রহমান স্কুল ম্যানেজিং কমিটিকে বিবাদী করে একটি বাটোয়ারা মামাল দাখিল করেন। দীর্ঘ ৭ বছর দেওয়ানি মামলা চলার পর ২০১৯ সালের আগস্ট মাসে আদালত বাদী শাহজাহান শেখ এই মামলায় রায় পান। পরবর্তীতে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি মামলায় পরাজিত হলে তারা আবার আপিল মামলা দায়ের করেন। কিন্তু আদালত আপিল মামলাটি ২০২৩ সালের ১৮ জুন খারিজ করে দেন। পরে বাদি পক্ষ ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে দেওয়ানি মামলা ১৭২/১২ চূড়ান্ত রায় ও ডিক্রিপ্রাপ্ত হন। বাদী শাহাজাহান শেখ পুনরায় দেওয়ানি জারি ০৩/২০২৪ মামলা দাখিল করেন। উক্ত মামলায় বিচার প্রক্রিয়ার পরে আদালত বাদী শাহজাহান শেখের পক্ষে এ বছর ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল ক্রয়কৃত জায়গা বুঝিয়ে দিতে আদেশ প্রদান করেন খুলনার বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ (তৃতীয়) বিচারক মো. বুলবুল আহমেদ। আদেশের প্রেক্ষিতে তিনি খুলনা জেলা প্রশাসক বরাবর একজন বিজ্ঞ নির্বাহী মাজিস্ট্রেট এর জন্য ও পুলিশ ফোর্স প্রেরণের জন্য পুলিশ সুপারের নিকট পত্র প্রদান করেন। তারই অংশ হিসেবে উক্ত ধার্য তারিখে খুলনার বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নাজমুস সাকিব, সহকারী কমিশনার ভুমি ও রূপসা থানার একজন এসআই, একজন এএসআই, ১০ জন পুলিশ কনস্টেবল ও ৪ জন নারী পুলিশ কনস্টেবল ধার্যকৃত তারিখের বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১ টায় রায়কৃত জমির ঘটনাস্থলে পৌছান। এ-সময় সহযোগিতায় উপস্থিত ছিলেন বিচারকের প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট কমিশনার মো. সেলিম শেখ, বাদী পক্ষের নিযুক্ত আইনজীবী রূপদাস রায়, অ্যাডভোকেট মলয় কান্তি রায়, অ্যাডভোকেট বুলবুল ইফতেখার আলী, অ্যাডভোকেট কামাল হোসেন, আদালত হতে নিয়োগপ্রাপ্ত তিনজন জারিকারক। আইনজীবী সহকারী সমিতির খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান টুকু ও সরকারি নিয়োগকৃত দু'জন ঢ়ুলী। এদিকে, বাদী পক্ষ বলেন, আদালত অবমাননাকারীরা আমাদেরকে মব সৃষ্টির মুহুর্তে জীবনে শেষ করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করেন। আমরা এ-সব ঘটনার প্রতিকারের দাবি জানাই। এ বিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক হায়দার আলী অস্বীকার করে বলেন, মব সৃষ্টি করতে আমরা ছাত্রদের উস্কানি দেইনি। আমাদেরও শরীর জ্বলে যাচ্ছে। সরকারি লোকের কথার বাহিরে আমরা একটাও কিছু করিনি। অ্যাডভোকেট কমিশনার মো. সেলিম শেখ বলেন, সরকারি কাজে স্কুলের প্রধান শিক্ষক হায়দার আলীসহ অন্যান্য শিক্ষক ও ম্যানেজিং কিমিটির কয়েকজন ও শিক্ষার্থীরা মব সৃষ্টি করে। এই সরকারি কাজে বাধা প্রদান করেছে যারা তাদের আইনের আওতায় আনার দরকার। যদি না আসে তাহলে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হবে।