দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে লাখ লাখ চালকের প্রশিক্ষণ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। সরকার দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাঁচ বছরে ভারী গাড়ির তিন লাখ দক্ষ চালক তৈরির পরিকল্পনা করেছিল। সেজন্য উন্নয়ন প্রকল্প ছক তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছর ধরে ওই উদ্যোগ পড়ে আছে ফাইলবন্দি হয়ে। পাশাপাশি অকার্যকর করে রাখা হয়েছে সরকারিভাবে নিবন্ধিত এক হাজার ৬৫০ প্রশিক্ষকের বেশির ভাগকেই। অথচ সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে প্রশিক্ষণের অভাবে সেভাবে বাড়ছে না দক্ষ গাড়িচালক। বিআরটিএ এবং বিআরটিসি সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে পেশাদার গাড়িচালকদের প্রশিক্ষণব্যবস্থা বিআরটি এবং বিআরটিসি চালু রেখেছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় খুবই অপ্রতুল। ফলে অহরহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে দক্ষ চালকের অভাবে। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যানুযায়ী অতিগতি প্রায় ৯০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার কারণ। তাছাড়া সড়ক ও গাড়ির অবস্থাসহ অন্যান্য কারণেও ঘটছে দুর্ঘটনা। সেজন্যই বিশেষজ্ঞ মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বিআরটিসি ‘ভারী যানবাহনের চালক তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান’ শীর্ষক প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছিলো। ওই প্রকল্পটি বছরে ৬০ হাজার দক্ষ চালক তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করে তৈরি করা হয়েছিল। বিআরটিসির তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণটি ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত চালিয়ে তিন লাখ দক্ষ ভারী যানবাহনের চালক তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৯৭৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ তা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। কিন্তু ২০২০ সালের করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে প্রকল্প অনুমোদন ঝুলিয়ে রাখা হয়। যদিও বারবার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা হয়েছে এবং প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় সংযোজন-বিয়োজন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রকল্প ব্যয় আরো কমিয়ে তা অনুমোদনের গুরুত্ব তুলে ধরে তা অনুমোদন করানোর চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু তারও অনুমোদন করা সম্ভব হয়নি।
সূত্র জানায়, বিআরটিসি ২০১৯ সালে প্রশিক্ষণসংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করেছিল । ওই প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, হালকা বা মধ্যম লাইসেন্সধারী গাড়িচালকদের মধ্যে ভারী যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা আছে এমন গাড়িচালকদের দুই সপ্তাহ মেয়াদি ভারী যানবাহন চালনার উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। হালকা ও মধ্যম লাইসেন্সধারী গাড়িচালকদের মধ্যে যাদের ভারী যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা নেই, তারা পাবেন চার সপ্তাহ মেয়াদি ভারী যানবাহন চালনার উচ্চতর প্রশিক্ষণ। প্রকল্পের আওতায় পাঁচ বছরে তিন লাখ প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়। তার মধ্যে বিআরসিটির ২৪টি কেন্দ্রে, আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের (এএফডি) ২৪টি কেন্দ্রে, রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটির (আরটিসি) ২৬টি কেন্দ্রে, একটি বাংলাদেশ পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ও ১৯টি আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (বিআরটিএ নিবন্ধিত সক্ষম ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান) প্রশিক্ষণ পরিচালনার প্রস্তুতি নেয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রথমে প্রশিক্ষণার্থী প্রতি দৈনিক খোরাকি ভাতা এক হাজার টাকা ও খাবার ভাতা ৩০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সব প্রস্তুতির পর প্রকল্প অনুমোদিত হয়নি।
সূত্র আরো জানায়, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের বড় ও উপযোগী তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। দেশে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৬৫০ জন বিআরটিএ অনুমোদিত প্রশিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু তাদের বেশির ভাগকেই সরকার কাজে লাগাচ্ছে না। ২০১২ সালের দিকে বিআরটিএর তৎকালীন তত্ত্বাবধানে ২০০ প্রশিক্ষক তৈরি করা হয়। তারপর ধীরে ধীরে আরো প্রশিক্ষক তৈরি করা হয়। ২০১৮ সালে সরকার একটি প্রকল্পের মাধ্যমে এক হাজার ৪২০ জন প্রশিক্ষক তৈরি করে। তাদের কাজ হওয়ার কথা ছিল,ৎ সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে গাড়ি চালকদের প্রশিক্ষণ দেয়া ও বিআরটিএ অনুমোদিত বিভিন্ন ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নেয়া। বর্তমানে দেশে প্রায় দেড়শটি বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে।
এদিকে বিআরটিএ অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুল সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ঘটনা কমানোর ক্ষেত্রে চালকদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষকদের কাজে যুক্ত করা জরুরি। প্রশিক্ষণের জন্য বিভিন্ন সময় প্রকল্প প্রস্তাবব তৈরি করা হয় কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণে যুক্ত হওয়ার আশায় কেউ কেউ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করেছিলো। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় অনেকে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। অথচ সরকার উদ্যোগ নিলে প্রশিক্ষকরা গাড়িচালকদের ভালো মানের প্রশিক্ষণ দিয়ে দুর্ঘটনা কমাতে পারে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, গত ১৭ থেকে ২৬ মার্চ পর্যন্ত ৩৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৭৯ ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে। আর বেশির ভাগ দুর্ঘটনার বড় কারণ চালকের দক্ষতার অভাব। প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হলে এমন অবস্থা হতো না।
অন্যদিকে এ বিষয়ে বিআরটিসির জেনারেল ম্যানেজার (আইসিডব্লিউএস ও প্রশিক্ষণ) ফাতেমা বেগম জানান, বিভিন্ন কারণে ওই প্রকল্প অনুমোদন হয়নি। এ অবস্থায় বিআরটিসির স্কিলস ফর ইন্ডাস্ট্রি কম্পিটিটিভনেস অ্যান্ড ইনোভেশন প্রোগ্রামের আওতায় ৮ হাজার গাড়িচালককে প্রশিক্ষণ দেয়ার লক্ষ্যে গত বছর থেকে কর্মসূচি চলছে এবং তা ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলবে। তাছাড়া বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৬০ হাজার গাড়িচালককে প্রশিক্ষণ দেয়ার কর্মসূচি মে থেকে শুরু হবে। বিআরটিসির চারটি ইনস্টিটিউটসহ সব মিলে ২৭টি কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে।