চলতি বাজেটে সরকার শুল্ক কমালেও বাজারে বাড়ছে ভোগ্যপণ্যের দাম

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম
চলতি বাজেটে সরকার শুল্ক কমালেও বাজারে বাড়ছে ভোগ্যপণ্যের দাম

বাজেটে সরকারের শুল্ক রেয়াতেও বাজারে বাড়ছে ভোগ্যপণ্যের দাম। চলতি বাজেটে সরকার ৬০টি নিত্যপণ্যের আমদানি কমিয়েছে উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর। কিন্তু তারপরও বিরূপ আবহাওয়া, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতায় পাইকারি বাজারে নিত্যপণ্যে দামের ঊর্ধ্বমুখীতায় খুচরা বাজারেও বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। বিগত কয়েকদিনে পাইকারি বাজারে দাম বেড়েছে গম, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, মোটা মসুর, মসলা, রসুন, পেঁয়াজসহ বেশকিছু নিত্যপণ্যের। আর গম, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রভাব পড়েছে আটা-ময়দাসহ খাদ্যপণ্যের বাজারেও। তাছাড়া রফতানি অনুমতির কারণে বাজার থেকে সংগ্রহ শুরু হয়েছে সুগন্ধি চাল। ফলে রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে সুগন্ধি চালের দাম। সাধারণ দেশে বর্ষা মৌসুমে শাকসবজি, মাছ ও পোলট্রিজাতীয় খাদ্যপণ্যের উৎপাদন খরচ কিছুটা বাড়ে। আর ওসব খাদ্যের দাম বাড়ায় সীমিত আয়ের ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়ছে। নিত্যপণ্যের আমদানিকারক এবং পাইকারি বাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকার ঘোষিত চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের উৎসে ও অগ্রিম কর সর্বোচ্চ ৫ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। আর অগ্রিম কর নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসায়ীদের একপর্যায়ে ফেরত আসার কথা। কিন্তু বাস্তবে পণ্য বিক্রি হওয়ার পর পরই তা ফেরত আসে না। বরং ব্যবসায়ীদের প্রদেয় বিভিন্ন শুল্ক-করের সঙ্গে তা সমন্বয় হয়। সাধারণত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অগ্রিম করকে (এআইটি) পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে হিসাব করে লাভ-লোকসান। আর বাজেটে শুল্ক কমানোতে ব্যবসায়ীদের আর্থিক সাশ্রয় হওয়ায় পণ্যের দাম কমার কথা থাকলেও সামপ্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে বুকিংয়ে দর বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতি সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে। তাছাড়া জ্বালানি ঘাটতিতে দেশে অনেক পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ওসব কারণেই পাইকারি বাজারে বাড়তে শুরু করেছে ভোগ্যপণ্যের দাম।

সূত্র জানায়, দেশে পাইকারি পর্যায়ে দেড় মাস আগেও ৬ হাজার ২৫০ থেকে ৬ হাজার ৩০০ টাকা ছিলো মণপ্রতি (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) পাম অয়েলের দাম। বর্তমানে ৬ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর সুপার পাম অয়েলে ১০০-১২০ টাকা বেড়ে ৬ হাজার ৫৫০ থেকে ৬ হাজার ৬০০ টাকায় লেনদেন হচ্ছে। আর সয়াবিনের দাম ১৫০ টাকা বেড়ে লেনদেন হচ্ছে ৭ হাজার ৪০০ টাকায়। বিশ্ববাজারে সামপ্রতিক সময়ে বুকিং দর কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় সরকারিভাবে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো না হলেও পাইকারি বাজারে খোলা ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। তাছাড়া চিনির দাম মণপ্রতি ৩ হাজার ৪৮০ থেকে ৩ হাজার ৪৫০ টাকায় নেমে এসেছিলো। কিন্তু  বর্তমানে মণপ্রতি চিনি লেনদেন হচ্ছে ৩ হাজার ৬৬০ টাকায়। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পাইকারিতে চিনির দাম ১৬০-১৮০ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি দেশের পাইকারি বাজারে বিগত কয়েক মাস ধরে ১ হাজার ২৮০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা ছিলো প্রতি মণ গমের দাম। কিন্তু দুই সপ্তাহ ব্যবধানে বেড়ে তা উঠেছে ১ হাজার ৪৫০ টাকায়। এমনকি কয়েক দিনে ওই দাম ১ হাজার ৪৩০ থেকে ১ হাজার ৪৩৫ টাকায় ওঠানামা করছে। আর গমের দাম বাড়ায় ফ্লাওয়ার মিলগুলো বাড়িয়ে দিয়েছে আটা ও ময়দার দাম। ইতি মধ্যে প্রতি কেজি খোলা ও প্যাকেটজাত আটা-ময়দার দাম বেড়েছে ৪-৫ টাকা পর্যন্ত।

সূত্র আরো জানায়, গমের আন্তর্জাতিক বাজার চড়া হতে শুরু করেছে বিগত ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে। ওই যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। সমপ্রতি ওই সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য রফতানিতে ঝুঁকি বেড়েছে। ফলে দুই বছরের মধ্যে গম সর্বোচ্চ দামে লেনদেন হচ্ছে গম। আর তা প্রভাবে গত কয়েকদিনে দেশের বাজারে গমের দাম মণপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা বেড়েছে। মূলত রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বের মোট চাহিদার ২৮ শতাংশ গম সরবরাহ করে। ওই দুই দেশের সংঘাত অব্যাহত থাকলে গমের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে গম উত্তোলন মৌসুম শুরু হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধের কারণে মৌসুমের সর্বোচ্চ সময়ে রফতানি ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে। এ অবস্থায় অনেক দেশই চাইছে বিকল্প উৎস থেকে গমের বুকিং নিশ্চিত করতে। যে কারণে গমের আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত রেকর্ড মূল্য বৃদ্ধি বাংলাদেশের বাজারেও প্রভাব ফেলেছে।

এদিকে গমের মূল্য বৃদ্ধিতে দেশের বাজারে আটা ও ময়দার দাম বাড়ছে। এক মাসের ব্যবধানে ৪ থেকে ৯ শতাংশ পর্যন্ত আটা-ময়দার দাম বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি খোলা সাদা আটা খুচরায় ৪৫-৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাসের মধ্যে খোলা সাদা আটার দাম প্রায় ৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। আর প্যাকেটজাত আটার দাম এক মাসে কেজিপ্রতি ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে খুচরায় ৬০-৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর খোলা ময়দা কেজিপ্রতি ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে লেনদেন হচ্ছে ৬০ টাকায় ও প্যাকেটজাত ময়দা ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে এক মাসের ব্যবধানে খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৬৫-৭৫ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশে উল্লেযোগ্য পরিমাণ বেড়েছে আটা-ময়দার দাম। তার মধ্যে খোলা আটার দাম এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, প্যাকেট আটা ১৯ দশমিক শূন্য ৫, খোলা ময়দা ৯ দশমিক শূন্য ৯ ও প্যাকেটজাত ময়দার দাম বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ডেল্টা এগ্রোফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক জানান, বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে গমের দাম। প্রতি টন ২৬০ ডলারের গম এখন বেড়ে ২৯০ ডলারে ঠেকেছে। গমের মূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের নতুন করে সামরিক উত্তেজনা। আমদানিকারকদের জন্য ফ্রেইট খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্যশস্য সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় এ অঞ্চলের সংঘাত পণ্যবাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে।

নিত্যপণ্যের দাম প্রসঙ্গে টিসিবির সহকারী পরিচালক (মার্কেট ডেটা) শতদল মণ্ডল জানান, টিসিবি নিয়মিত প্রধান প্রধান ভোগ্যপণ্যের বাজার মনিটর করে। দামের উত্থান-পতন হলে তা বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হয়। সামপ্রতিক সময়ে ভোগ্যপণ্যের মধ্যে যে কয়েকটির দাম বেড়েছে সে বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে জানানো হয়েছে।