দারিদ্র্য-অনিশ্চয়তায় বন্দি

কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে

এফএনএস | প্রকাশ: ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
কৃষকের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে হবে

বাংলাদেশের কৃষি খাতে উৎপাদন বেড়েছে, প্রযুক্তি এসেছে, নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের সঙ্গে কৃষকের জীবনমানের উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে ক্ষুদ্র কৃষকরা, যারা দেশের মোট খাদ্য উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি যোগান দেন, তারা আয়, জমির মালিকানা ও জীবনমানের সূচকে বড় কৃষকদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। উৎপাদন বাড়লেও কৃষকের আয় বাড়েনি- এটাই আমাদের কৃষি খাতের নির্মম বাস্তবতা। ক্ষুদ্র কৃষকরা ঋণ করে অন্যের জমিতে চাষ করেন, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলান, কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখেন উৎপাদন খরচও উঠছে না। বাজারকাঠামোর দুর্বলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে তারা বাধ্য হন কম দামে ফসল বিক্রি করতে। ফলে কৃষকের ভাগ্যের চাকা ঘোরে না, বরং দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার বৃত্তে আটকে থাকেন। এই বাস্তবতা শুধু কৃষকের জীবনে নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা গেছে, ক্ষুদ্র কৃষকের শ্রম উৎপাদনশীলতা বড় কৃষকের তুলনায় অনেক কম। জাতীয় পর্যায়ে শ্রম দিবসপ্রতি গড় উৎপাদনশীলতা যেখানে এক হাজার ৮৬৮ টাকা, সেখানে ক্ষুদ্র কৃষকের ক্ষেত্রে তা মাত্র এক হাজার ৪৯৪ টাকা। জমির মালিকানা ও জীবনমানেও বৈষম্য স্পষ্ট। প্রায় অর্ধেক কৃষক পরিবারের ঘরের মেঝে এখনো মাটির, আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব রয়েছে পরিবারের বড় অংশে। এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবারের হার মাত্র ৫.৭ শতাংশ। এসব সূচক স্পষ্ট করে যে ক্ষুদ্র কৃষকরা উন্নয়নের মূল স্রোতে নেই। এই বৈষম্য শুধু কৃষকের জীবনে নয়, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ক্ষুদ্র কৃষকের আয় ও জীবনমান উন্নয়ন অপরিহার্য। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত পদক্ষেপ- বাজারকাঠামো সংস্কার, কৃষিঋণ সহজলভ্যতা, কৃষি প্রযুক্তি সহায়তা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সমপ্রসারণ। ক্ষুদ্র কৃষকের আয় বাড়ানো ছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই হবে না। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে হবে, বাজারে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং কৃষককে শুধু উৎপাদক নয়, বরং দেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। কৃষকের হাতে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা না থাকলে তারা সবসময়ই বঞ্চিত হবেন। তাই বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে হবে এবং কৃষকের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। আমরা মনে করি, ক্ষুদ্র কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তন মানে শুধু কৃষি খাতের উন্নয়ন নয়, বরং জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা। খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ উন্নয়ন-সবকিছুই ক্ষুদ্র কৃষকের উন্নতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সরকারকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র কৃষকরা উন্নয়নের মূল স্রোতে যুক্ত হতে পারেন।