বাংলাদেশের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের বোঝায় জর্জরিত। দেশে থাকা সম্পদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ঋণ আদায় সম্ভব হচ্ছে না। আবার কিছু ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে কিংবা ঋণগ্রহীতা বিদেশে অবস্থান করছেন। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো এবার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে, বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে এ কার্যক্রমের আওতায় আনা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ বা সম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে এমন ১২টি দেশকে অনুসন্ধানের আওতায় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন এবং সম্ভাব্য মূল্য যাচাই করছে। সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তা স্থগিত, জব্দ বা আটকের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এই উদ্যোগকে ব্যাংক খাতের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। দেশে মামলা চললেও বিদেশে থাকা সম্পদের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এবার আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে সেই পথ খুলছে। চুক্তি অনুযায়ী উদ্ধার না হলে কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হবে না, ফলে ব্যাংকগুলোকে আগাম বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হচ্ছে না। তবে এ প্রক্রিয়া সহজ নয়। বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ, বিক্রি কিংবা নিষ্পত্তি করে অর্থ দেশে ফেরানো সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এতে সময় লাগতে পারে। তারপরও দীর্ঘদিন আটকে থাকা বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্তের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আমরা মনে করি, খেলাপি ঋণ আদায়ে শুধু দেশীয় আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অপরিহার্য। অর্থপাচার দমন, বিদেশে সম্পদ উদ্ধার এবং ব্যাংক খাত সংস্কার একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংক খাতকে দুর্বল করছে না, বরং দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ ব্যাংক খাতের আস্থা পুনরুদ্ধারের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি সফল হলে শুধু ঋণ আদায় নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায়ও নতুন দিগন্ত খুলবে।