২০১১ সালের মিরসরাই ট্র্যাজেডি বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা ইতিহাসে এক গভীর বেদনার অধ্যায়। এক দুর্ঘটনায় ৪৫ শিক্ষার্থীর প্রাণহানি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই ঘটনার ১৫ বছর পরও শিক্ষার্থীদের সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি-এ বাস্তবতা উদ্বেগজনক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৩২০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬০ শিক্ষার্থীর প্রাণহানির তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাই তুলে ধরে। প্রতিটি সংখ্যা একটি অপূর্ণ স্বপ্ন, একটি শোকাহত পরিবার এবং সমাজের জন্য অপূরণীয় ক্ষতির প্রতীক। বিষয়টি আরও উদ্বেগের কারণ, কারণ এসব দুর্ঘটনার বড় একটি অংশ প্রতিরোধযোগ্য। সড়ক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, ট্রাফিক আইন অমান্য, অতিরিক্ত গতি, নিরাপদ পারাপারের অবকাঠামোর অভাব এবং সচেতনতার ঘাটতি মিলেই এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। অথচ অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং, গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড কিংবা প্রশিক্ষিত ট্রাফিক সহায়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে ব্যস্ত মহাসড়ক পার হয়েই শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে পৌঁছাতে হয়। ফলে তাদের নিরাপত্তা অনেকাংশেই ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। যাত্রী কল্যাণ সমিতি যে পাঁচ দফা সুপারিশ দিয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘদিনের দাবি। পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা অন্তর্ভুক্ত করা, নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে নিরাপত্তা কমিটি গঠন-এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। তবে শুধু সচেতনতা কর্মসূচিই যথেষ্ট নয়; কার্যকর আইন প্রয়োগ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার এবং দায়িত্বশীল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও সমানভাবে প্রয়োজন। সড়ক নিরাপত্তা কেবল পরিবহন খাতের বিষয় নয়; এটি জননিরাপত্তা, শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। যে রাষ্ট্র তার শিক্ষার্থীদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সেখানে উন্নয়নের অনেক অর্জনই প্রশ্নের মুখে পড়ে। মিরসরাই ট্র্যাজেডি যেন কেবল স্মরণসভা বা শোকের দিনে সীমাবদ্ধ না থাকে। সেই ঘটনার শিক্ষা নীতিনির্ধারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আইন প্রয়োগে প্রতিফলিত হওয়াই সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি হবে। শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ একটি নিরাপদ সড়ক শুধু দুর্ঘটনা কমায় না, এটি একটি দায়িত্বশীল ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনেরও অপরিহার্য শর্ত।