তীব্র গ্যাস সঙ্কট দেশ। দেশীয়ভাবে গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া ঘাটতি বাড়ছে। আর আগামীতে ওই ঘাটতি আরো তীব্র হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ক্রমাগত বেড়ে চলেছে গ্যাসের আমদানি নির্ভরতা। যদিও গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে পেট্রোবাংলার চলমান ৫০ কূপ খনন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। কিন্তু সেখান থেকেও কাঙ্ক্ষিত গ্যাস মিলছে না। সেজন্য অতীতের করা বিভিন্ন দ্বিমাত্রিক জরিপের তথ্য-উপাত্তের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতাকে সংশ্লিষ্টরা দায়ি করছে। কারণ অনেক এলকাতেই পেট্রোবাংলা টুডি সিসমিক সার্ভের ভিত্তিতে কূপ খনন করে গ্যাস পায়নি। আবার অনেক কূপে প্রত্যাশা অনুযায়ী গ্যাস মেলেনি। পরিস্থিতি উন্নয়নে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কূপ খননের পাশাপাশি ত্রিমাত্রিক জরিপ জরুরি। অনিশ্চিত ও অনুমানের ভিত্তিতে কূপ খনন করে অর্থ অপচয় করার সুযোগ নেই। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, পেট্রোবাংলা এবং বাপেক্স সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, এখন পর্যন্ত দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে ৫৪ হাজার ৬৪৩ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক জরিপ আর ৭ হাজার ১৩৭ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক জরিপ করা হয়েছে। ওসব সিসমিক সার্ভে দেশী-বিদেশী কোম্পানির মাধ্যমে করা হয়েছে। দেশে তেল-গ্যাস আবিষ্কারের শুরু থেকে বিদেশী ৭-৮টি কোম্পানি টুডি ও থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করেছে। তারপর বাপেক্স বিগত ২০১০ সালে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) ও সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) অধীনে থাকা কূপে দ্বিমাত্রিক জরিপ শুরু করে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে টুডি জরিপের মাধ্যমে কূপ খনন করে গ্যাসের যে মজুদ ও উৎপাদনের প্রাক্কলন করা হয়েছিল, ওই পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যায়নি। এমনকি অনেক এলাকায় কূপ খনন করে মেলেনি গ্যাসই। মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও ভূগর্ভস্থ গঠন দেখতে টুডি সিসমিক জরিপ বা দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তার মাধ্যমে মাটির নিচের বিভিন্ন স্তরের অবস্থান ও গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ একধরনের কম্পনযন্ত্রের সাহায্যে শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে দ্বিমাত্রিক রেখাচিত্র তৈরি করা হয়। টুডি জরিপে ভালো ফলাফল পাওয়া গেলেও সুনির্দিষ্ট এলাকায় গ্যাসের সুস্পষ্ট মজুদ বিষয়ে নিশ্চিত হতে ও নিখুঁত চিত্র পেতে প্রয়োজন ত্রিমাত্রিক জরিপ।
সূত্র জানায়, দেশে গ্যাস অনুসন্ধানে বিগত দুই যুগে মাত্র ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। তার মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ৩টি গ্যাস উৎপাদন কোম্পানির আওতায় ২০০০ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত কূপ খননে ৬ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরো অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা গ্যাসকূপ খননসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে। আর বাপেক্স ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ হাজার ৮৬৬ লাইন কিলোমিটার টুডি সিসমিক সার্ভে ও ৩৮০ বর্গকিলোমিটার থ্রিডি সিসমিক সার্ভে করেছে। তবে স্থানীয় গ্যাস খাতে তৎপরতা বাড়াতে অনাবিষ্কৃত এলাকায় বিশেষত পাহাড়ি এলাকা ও চরাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা প্রয়োজন। তবে ওসব এলাকায় বিস্তৃত অনুসন্ধান ও কূপ খনন করতে বাড়াতে হবে রিগের সংখ্যাও। কারণ স্থানীয় গ্যাস খাতের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ডিপ ড্রিলিং অত্যন্ত জরুরি। পুরনো তথ্য-উপাত্তে যেসব চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকায় গ্যাসের উপস্থিতি রয়েছে, সেগুলোয় অনুসন্ধান শুরু করা প্রয়োজন। পেট্রোবাংলার বিপুল পরিমাণ টুডি সার্ভে রয়েছে। গ্যাসের উপস্থিতি আরো পরিষ্কারভাবে জানতে কূপ খননের পাশাপাশি জরুরি থ্রিডি সার্ভে।
সূত্র আরো জানায়, গ্যাসের ক্ষেত্রে যতো তথ্য-উপাত্ত, যতো প্রমাণ, ততো বেশি মজুদের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। সেজন্য দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক জরিপের পাশাপাশি হলো ডেটা অ্যাকুইজিশন, প্রসেসিং ও ইন্টারপ্রিটেশন গুরুত্বপূর্ণ। কারা তা করছে, কোন মেথড ব্যবহার করে করা হচ্ছে, ওসবের ওপর নির্ভর করে গ্যাসের মজুদ নিশ্চয়তা। তবে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি কূপ খনন। দেশের দ্বিমাত্রিক জরিপ ব্যবহার করেও অনেক বড় বড় গ্যাসকূপ খনন করা হয়েছে। তবে ত্রিমাত্রিক জরিপ করে আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তবে দেশে গ্যাস খাতে বৃহৎ আকারে অনুসন্ধানে সরকারের দক্ষ লোকবল, যন্ত্রাংশ ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কূপ খননে যে কয়টি রিগ রয়েছে, তা যথেষ্ট নয়। বর্তমানে পেট্রোবাংলার পাঁচটি রিগ কূপ খননে কাজ করছে। আরো দুটি কেনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের গ্যাস সংকট মেটাতে সরকার তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) নির্মাণে প্রাধান্য দিচ্ছে। ইতিমধ্যে মহেশখালীতে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে চীনের একটি প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আর পায়রা, মোংলা ও হিরণ পয়েন্টে আরো নতুন তিনটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী। তবে গ্যাস সংকটের টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিতে এলএনজি টার্মিনাল বাড়ানোর চেয়ে এ খাতে অনুসন্ধান বৃদ্ধি, মজুদ নিশ্চিতে কূপ খননের পাশাপাশি ত্রিমাত্রিক জরিপ ও রিগে বিনিয়োগ প্রয়োজন। ইতিমধ্যে বিদ্যমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের নানাবিধ সমস্যা দৃশ্যমান। আর নতুন টার্মিনাল নির্মাণ হলে অর্থনীতিতে বিভিন্নমুখী চাপ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিশ্চয়তার মতো বিষয় রয়েছে। ইতিমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে এলএনজি। বিগত ৮ বছরে ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার বেশি এলএনজি আমদানি হয়েছে। তাতে সরকারকে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে। দেশে এলএনজি সরবরাহে দুটি টার্মিনাল রয়েছে। দৈনিক সেগুলোর সরবরাহ সক্ষমতা ১১০ কোটি ঘনফুট। নতুন টার্মিনাল নির্মাণ অনুমোদন দিলে সরকারের গ্যাস আমদানি ব্যয় বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হবে। তার চেয়ে বরং স্থানীয় গ্যাস খাতে কূপ খনন, রিগে বিনিয়োগ, ত্রিমাত্রিক জরিপ এলাকা বাড়িয়ে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) মো. শোয়েব জানান, থ্রিডি সার্ভে বেশি করা গেলে কূপগুলোয় কী পরিমাণ রিজার্ভ রয়েছে তা আরো পরিষ্কার তথ্য-উপাত্তের পাশাপাশি গ্যাসের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পেট্রোবাংলা অনেক এলাকায় এখন থ্রিডি প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।