‘শিক্ষকতা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় খুলুন’, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে শফিকুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম
‘শিক্ষকতা করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় খুলুন’, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে শফিকুর রহমান
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে তাকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে ‘শিক্ষকের ভূমিকা’ পালন করতে চাইছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটা ইউনিভার্সিটি খুলুন। আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই।”

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের প্রথম কার্যদিবসে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ মিনিট হট্টগোলের পর ফ্লোর নিয়ে এসব কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা। এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও আচরণকে ‘পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম’ আখ্যা দিয়ে দুঃখ প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্ট বক্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান।

ঘটনার সূত্রপাত হয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে। জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর একটি প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “এটা প্রশ্ন হলো, না পল্টনের বক্তৃতা হলো, বুঝতে পারিনি।”

এরপর পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংসদ সদস্যদের ওপর হামলা, ছিনতাই এবং বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি এসব বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদক্ষেপ জানতে চান।

প্রশ্নটি আবার শোনার পর জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী দলের সদস্যকে উদ্দেশ করে বলেন, “শাহবাগ স্কয়ারে বক্তৃতা দেওয়া আর পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেওয়া এক কথা না।”

এই বক্তব্যের পরই বিরোধী দলের সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ শুরু করেন। কয়েকজন আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি কাউকে উদ্দেশ করে কথাটি বলেননি। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “মাননীয় স্পিকার আমি আপনার শেল্টার চাচ্ছি।”

হট্টগোল চলতে থাকলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একপর্যায়ে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা জানান। তবে তাতেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ চালিয়ে গেলে একপর্যায়ে তিনি নিজের আসনে বসে পড়েন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তখন বারবার বিরোধী দলের সদস্যদের নিজ নিজ আসনে বসার অনুরোধ করেন। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হলে বিরোধীদলীয় নেতাকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে। স্পিকার আরও বলেন, সদস্যরা মাইকে সুযোগ নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কথা বললে সবাই তা শুনতে পারবেন।

একপর্যায়ে স্পিকার বলেন, “এটা তো আওয়ামী লীগের আমল না। এখানে আপনারা ইচ্ছেমতো সরকারকে ক্রিটিসাইজ করতে পারছেন।” তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে অনুরোধ করেন।

পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবার বক্তব্য শুরু করলে স্পিকার তাকে নিজের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলেন। তখনো বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছিলেন। স্পিকার বলেন, “আপনারা কি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শুনতে রাজি না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমি বিরোধী দলের নেতাকে দেব।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরে শফিকুল ইসলাম মাসুদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে বলেন, কোথায় ছিনতাই হয়েছে বা কোনো মামলার আসামি গ্রেপ্তার হয়নি, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। ঢালাওভাবে অভিযোগ না তুলে নির্দিষ্ট প্রশ্ন করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সে কারণেই তিনি বলেছেন এটি মহান জাতীয় সংসদ।

এরপর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান। শুরুতেই সরকারি দলের কয়েকজন সদস্যের মন্তব্যের জেরে আবার উত্তেজনা তৈরি হলে তিনি বলেন, “বক্তব্য কি আপনি দেবেন, না আমি দেব? আপনি দেন।”

পরে স্পিকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এটা অশোভন। আমার বক্তব্যের সময় যদি এইভাবে কমেন্টস করা হয়, তাহলে আমার এখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি সবাইকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছেন। তার ভাষায়, “উনি নিজেকে কী মনে করেন, আমি বুঝতে পারি না।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে নিজেকে শিক্ষকের ভূমিকায় তুলে ধরেছেন অভিযোগ করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “এমনকি তিনি সেই দুঃসাহস এখানে দাঁড়িয়ে দেখিয়েছেন, তিনি বলেছেন যে এই সংসদে তিনি শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন। আমরা তার ছাত্র হওয়ার জন্য এখানে আসি নাই। শিক্ষকতা করতে হলে তিনি একটা ইউনিভার্সিটি খুলুন। ওখানে যার পছন্দ গিয়ে ভর্তি হবে, উনার লেকচার শুনবে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আচরণকে ‘পার্লামেন্টারিয়ান ফ্যাসিজম’ আখ্যা দিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, “এই পার্লামেন্টের সৌন্দর্য বিধানের জন্য উনাকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে এবং উনার বক্তব্য সংসদের এই কার্যপ্রণালি থেকে এক্সপাঞ্জ করতে হবে।”

তিনি বলেন, দাবি মেনে নেওয়া না হলে অপমান নিয়ে বিরোধী দলের সংসদে বসার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তার বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।

স্পিকারের মন্তব্য নিয়েও আপত্তি
হট্টগোলের সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, বিরোধী দলের সদস্যদের তুলনায় সরকারি দলের সদস্য সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিন গুণ। এ মন্তব্যেরও প্রতিবাদ জানান বিরোধীদলীয় নেতা।

তিনি বলেন, “আপনার একটি কথায় সামান্য কষ্ট সৃষ্টি হয়েছে। আপনি কনক্লুশনে গিয়ে বললেন যে, এদিকের চাইতে ওইদিকে তিনগুণ আছেন। এটা ভালো লাগলো না।”

শফিকুর রহমান বলেন, তিনি সংসদকে কোনো সংখ্যা বা গুণের ভিত্তিতে বিভক্ত করার পক্ষে নন। “ভালো কাজে আমরা সবাই এক হবো, কিন্তু অন্যায় কিছু হলে প্রতিবাদ করবো”, বলেন তিনি।

পরে স্পিকার বলেন, কাউকে ছোট করার উদ্দেশ্যে তিনি ওই বক্তব্য দেননি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ না দেওয়ার জন্য বিরোধী দলের সদস্যদের সমালোচনা করেন তিনি।

এরপর সংসদের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পিকার বলেন, “আমি কিন্তু সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। আজকে যেভাবে একে অন্যকে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধা দেওয়ার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করেছি, এটি সংসদের জন্য কোনো ভালো লক্ষণ নয়।”

তিনি বলেন, অনেক কষ্টের পর দেশে গণতন্ত্র অর্জিত হয়েছে। গণতন্ত্র বহাল রাখতে সংসদের প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব রয়েছে। পাশাপাশি সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি মেনে চলার আহ্বান জানান স্পিকার।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে