একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো শ্রেণিকক্ষ। সেখানে যদি মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত না হয়, তবে শিক্ষার্থীদের কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভর হয়ে পড়া অবশ্যম্ভাবী। সম্প্রতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, দায়সারাভাবে পাঠদান এবং শ্রেণিকক্ষের প্রতি অনীহার কারণে শিক্ষার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যদিও সব শিক্ষক বা সব প্রতিষ্ঠানকে একইভাবে মূল্যায়ন করা সমীচীন নয়, তবু বিভিন্ন মহল থেকে ওঠা ধারাবাহিক অভিযোগ পরিস্থিতির গুরুত্বই তুলে ধরে। শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি কেবল শিক্ষক বা কোচিংবাণিজ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, দুর্বল তদারকি এবং দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতাও এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। পরিকল্পনা কমিশনের গবেষণায় সরকারি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি এই বাস্তবতাকেই নির্দেশ করে। শ্রেণিকক্ষের ঘাটতি পূরণে কোচিং ও প্রাইভেটের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এতে একদিকে অভিভাবকদের আর্থিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময়ের পড়াশোনার চাপে মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষার প্রতি আস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ২২ সালের কোচিংবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় এই প্রবণতা আরও বিস্তার লাভ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান সরকারের অনলাইন ক্লাস মনিটরিং উদ্যোগ শিক্ষার মানোন্নয়নের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকির পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পরিদর্শন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যকর মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মপরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ দক্ষ ও উৎসাহিত শিক্ষক ছাড়া মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শিক্ষার মান উন্নয়ন কোনো একক পক্ষের দায়িত্ব নয়। সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থী-সবার সম্মিলিত দায়িত্ব ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শ্রেণিকক্ষকে আবারও শিক্ষার মূল কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন, শক্তিশালী তদারকি এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের বিকল্প নেই। টেকসই শিক্ষাসংস্কারের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করার ওপরই।