নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা ১১০০ ছাড়িয়েছে। নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ১১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ হাজার ৯০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ২৬ আগস্টের এই দুর্যোগের এক সপ্তাহ পরও ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও পাথরের নিচে নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। চীনের পক্ষেও ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, নিখোঁজ ৫৪৬ জন।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি) জানিয়েছে, দেশটিতে এ পর্যন্ত ৩২৪ জন বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ৩৯টি দেশের প্রায় ৫৯০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার নিখোঁজ নাগরিকের সংখ্যা ৪৩ থেকে কমে ৩৮ হয়েছে। কয়েকজন নিখোঁজ পর্যটক এরই মধ্যে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, যা স্বজনদের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে।
বন্যার পানির সঙ্গে নেমে আসা পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়েছে। সড়ক ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যেতে নতুন করে রাস্তা তৈরি করতে হচ্ছে।
চীনের সীমান্তবর্তী গিরং বন্দরের সড়কও বন্যায় পানির নিচে ও কাদায় চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। উদ্ধারকর্মীরা সেখানে একটি অস্থায়ী সড়ক তৈরি করেছেন। এর মাধ্যমে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে ধ্বংসস্তূপে তল্লাশি চালানোর প্রস্তুতি চলছে।
নেপালে অন্তত ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রায় ৯০০ কর্মীর নিখোঁজ হওয়ার খবর রয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন সুড়ঙ্গে আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষে সুড়ঙ্গগুলো ভরে যাওয়ায় সেখানে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
সার্চ ডগ, ভারী যন্ত্রপাতি, ড্রোনসহ বিভিন্ন উপায়ে নিখোঁজদের খোঁজা হচ্ছে। নেপাল সেনাবাহিনীর পাশাপাশি বিদেশি বিশেষজ্ঞরাও কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্ধারকাজে সহায়তা করছেন।
মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি এমন মরদেহগুলো গণকবর দেওয়া হচ্ছে। রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় বৃষ্টির মধ্যেই একাধিক গর্তে কয়েক ডজন মরদেহ দাফন করা হয়েছে।
প্রতিটি মরদেহের জন্য আলাদা নম্বর দেওয়া হচ্ছে। পরিচয় শনাক্তের জন্য ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ, মুখের ছবি ও অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য নথিভুক্ত করা হচ্ছে। পরে স্বজনদের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হলে মরদেহের বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
চীন নেপালকে ত্রাণ সহায়তার দ্বিতীয় চালান পাঠাচ্ছে। এর মধ্যে ড্রোন, ডিএনএ পরীক্ষার সরঞ্জাম ও পানি পরিশোধনের যন্ত্র রয়েছে। মরদেহ শনাক্তে সহায়তার জন্য চীনা ডিএনএ বিশেষজ্ঞদেরও পাঠানো হচ্ছে।
এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে স্বজন হারানোর অসহায় চিত্রও সামনে এসেছে। নেপালের সপ্তরী এলাকার বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ্ব তালকা সদা তাঁর একমাত্র ছেলে ১৯ বছর বয়সী বিনোদের খোঁজে পথে পথে ঘুরছেন।
২৬ আগস্ট বন্যার এক দিন আগে ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছিল তাঁর। এক মাস আগে রাসুয়া এলাকায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়েছিলেন বিনোদ। সেখানে সিমেন্ট মেশানোসহ বিভিন্ন ধরনের কাজ করতেন তিনি। তাঁর সঙ্গে কাজ করা ১৭ থেকে ১৯ বছর বয়সী আরও চার তরুণও নিখোঁজ রয়েছেন।
ছেলের খোঁজে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে সপ্তরী থেকে কাঠমান্ডু যান সদা। পাহাড়ি পথের কারণে প্রায় ২৯২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে তাঁদের নয় ঘণ্টা সময় লাগে। কাঠমান্ডুতে হাসপাতালে গিয়ে জীবিত ও মৃতদের তালিকায় ছেলেকে খুঁজেছেন। কিন্তু কোথাও তাঁর নাম, ছবি বা কোনো সন্ধান পাননি।
এরপর প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে নুয়াকোটের দিকে হাঁটা শুরু করেন তিনি। ভাঙা সড়ক পেরিয়ে পৌঁছান ত্রিশুলিতে। সেখানে বাজারজুড়ে কাদা, ধ্বংসাবশেষ ও বন্যার চিহ্ন দেখে আরও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
ছেলেকে খুঁজতে ধার করা দুই হাজার নেপালি রুপিরও কম টাকা নিয়ে বের হয়েছেন সদা। পথে একটি আবাসিক স্থানে এক রাত থাকার জন্য ১ হাজার ৫০০ রুপি দিতে হয়েছে। খাবার হিসেবে পেয়েছেন অল্প পরিমাণ ভাত। আরেক রাত সেখানে থাকলে হাতে থাকা টাকা শেষ হয়ে যাবে।
সদা ও তাঁর ভাই মরদেহ রাখার স্থান ও সেনা ক্যাম্পগুলোতে গিয়ে ছেলের খোঁজ নিতে চাইলেও বারবার বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, তাঁরা দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হওয়ায় অবহেলার শিকার হচ্ছেন।
ছেলের মোবাইলে বারবার ফোন করছেন সদা। কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছেন না। তবু তিনি হাল ছাড়তে চান না। তাঁর স্ত্রী তাঁকে ছেলেকে খুঁজে ফিরিয়ে আনার অনুরোধ করেছেন।
কখনো ছেলেকে জীবিত পাওয়ার আশা করছেন, আবার কখনো মনে করছেন বেঁচে থাকলে এত দিনে নিশ্চয়ই ফোন করত। তবু জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের দিকে ছেলের সন্ধানে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন তিনি।