তানোরে এখন আর শোনা যায়না ডাক পিয়নের সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ

এফএনএস (সাইদ হোসেন সাজু; তানোর, রাজশাহী) : | প্রকাশ: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
তানোরে এখন আর শোনা যায়না ডাক পিয়নের সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ

রাজশাহীর তানোরসহ সারা দেশের গ্রাম বাংলায় সকাল কিংবা দুপুরের নীরবতা ভেঙে ভেসে আসত সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ। কাঁধে ডাকের ব্যাগ ঝুলিয়ে পথে পথে ছুটে বেড়াতেন ডাকপিয়ন। একসময় তার আগমনের সাথে জড়িয়ে থাকত মানুষের কৌতূহল হয়তো প্রিয়জনের চিঠি এসেছে। একটি চিঠির জন্য অপেক্ষা করতে হতো দিনের পর দিন। দূর শহরে থাকা সন্তান, প্রবাসী স্বজন কিংবা প্রিয় মানুষের হাতে লেখা কয়েকটি কথা পৌঁছাতে সময় লাগলেও সেই অপেক্ষার মধ্যেই ছিল অন্যরকম আনন্দ। 

ডাক পিয়নের হাতে একটি খাম পৌঁছানোর পর সেটিকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হতো আবেগঘন মুহূর্ত। রাজশাহীর তানোর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও একসময় এমন দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। সাইকেল চালিয়ে ডাকপিয়ন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে পৌঁছে দিতেন চিঠি, চাকরির নিয়োগপত্র, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কিংবা দূরদেশে থাকা স্বজনের খবর। অনেকের কাছে তার আগমন ছিল আনন্দের বার্তা বহন করার মতো। হাতে লেখা চিঠিতে ছিলো উৎফুল্লতা, কৌতুহল এবং আলাদা এক উচ্ছাস ও আনন্দ। 

পরিচিত মানুষের হাতের লেখা, কাগজে জমে থাকা অনুভূতি আর মনের না বলা কথাগুলো বারবার পড়েও যেন শেষ হতো না। কেউ কেউ সেই চিঠি বছরের পর বছর যত্ন করে রেখে দিতেন সিন্দুক, আলমারি কিংবা বইয়ের ভাঁজে। সময় পেরিয়ে গেলেও সেসব চিঠি হয়ে উঠত জীবনের মূল্যবান স্মৃতি। তবে, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশে বদলে গেছে সেই চিত্র। মুঠোফোন, ইন্টারনেট, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও ভিডিও কল এখন যোগাযোগকে করেছে সহজ ও তাৎক্ষণিক। কয়েক সেকেন্ডেই দূর-দূরান্তের মানুষের সাথে কথা বলা কিংবা বার্তা পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।

সরেজমিনে তানোর উপজেলা সদর পোষ্ট অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, আগের মতো ব্যক্তিগত চিঠিরআনাগোনা নেই। চিঠির জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের ভীড়ও চোখে পড়ে না। ডাকঘরের কার্যক্রম থাকলেও মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগের বড় অংশই এখন চলে গেছে ডিজিটাল মাধ্যমের দখলে। ফলে ব্যক্তিগত চিঠির প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে এসেছে। বেড়েছে পার্সেল আদান প্রদান। তবে, এখন জরুরী চিঠিসহ পার্সেল আদান প্রদানে পোস্ট অফিসের প্রতি সাধারন মানুষের মাঝে আগ্রহ কমে কুরিয়ার সার্ভিসেই বেশী নির্ভর হয়ে পড়েছে মানুষ। 

তানোর উপজেলা সদর পোস্ট মাস্টার আব্দুল মালেক  বলেন, আগে ব্যক্তিগত চিঠির জন্য মানুষের আগ্রহ ছিল অনেক বেশি। দূরের স্বজনের চিঠি আসবে এই আশায় অনেকে পোস্ট অফিসে খোঁজ নিতেন। ডাকপিয়ন এলাকায় গেলে তাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে আলাদা আনন্দ ও কৌতূহল দেখা যেত। এখন মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কারণে মুহূর্তের মধ্যেই যোগাযোগ করা যায়। তাই ব্যক্তিগত চিঠির সংখ্যা অনেক কমে গেছে। তিনি বলেন, আমি নিজে এক সময় সাইকেলে ঘুন্টি বাজিয়ে চিঠি বিলি করেছি। 

তিনি বলেন, প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছে চিঠি পৌঁছে দিতে যেতে হতো। ডাকপিয়নের পরিচিত মুখ ও সাইকেলের ঘণ্টির শব্দ ছিল গ্রামীণ জীবনের স্বাভাবিক অংশ। এখন যোগাযোগের মাধ্যম বদলে যাওয়ায় সেই ব্যস্ততা আর নেই। ডাকপিয়নের কাজের ধরনেও এসেছে বড় পরিবর্তন। চিঠির ব্যবহার হয়তো কমে গেছে, ডাক পিয়নের সেই ব্যস্ত দিনও পেছনে পড়ে গেছে। কিন্তু একটি ছোট্ট খামের ভেতর প্রিয় মানুষের হাতের লেখা, অপেক্ষার আবেগ আর ভালোবাসার যে গল্প লুকিয়ে থাকত সেটি আজও মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে।

তানোর পৌর এলাকার ঠাকুর পুকুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল মালেক বলেন, আগে একটা চিঠির জন্য অনেক অপেক্ষা করতাম। ডাকপিয়নকে দূর থেকে দেখলেই মনে হতো, হয়তো আমার বাড়ির চিঠি আছে। চিঠি হাতে পাওয়ার পর পরিবারের সবাই মিলে পড়তাম। এখন মোবাইলে মুহূর্তেই খবর পাওয়া যায়, কিন্তু সেই সময়ের আনন্দটা আর পাওয়া যায় না। নবীনরা সেই অনুভূতি অনুভব করতে না পারলেও প্রবীণদের স্মৃতিতে ডাকপিয়ন শুধু একজন বার্তাবাহক ছিলেন না। তিনি ছিলেন অপেক্ষার অবসান ঘটানো একজন পরিচিত মানুষ। 

তিনি বলেন, ডাক পিয়নের হাতে আসা একটি খাম কখনো এনে দিত প্রবাসী সন্তানের খবর, কখনো স্বজনের ভালো মন্দের সংবাদ, আবার কখনো বদলে দিত কারও জীবনের গতিপথ। আজকের প্রজন্মের কাছে হাতে লেখা চিঠি অনেকটাই অপরিচিত। তাদের যোগাযোগের জগৎ গড়ে উঠেছে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও তাৎক্ষণিক বার্তার ওপর। তবু তানোরের প্রবীণদের স্মৃতিতে চিঠির সেই দিন গুলো এখনো উজ্জ্বল। তানোর উপজেলায় ১টি প্রধান উপজেলা পোস্ট অফিস এবং বিভিন্ন ইউনিয়ন ও এলাকায় মোট ২২টি শাখা ও উপশাখা ডাকঘর রয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে