কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে জমি সংক্রান্ত বিরোধে স্থানীয় সালিশের সিদ্ধান্ত না মানায় একটি পরিবারের ২০ সদস্যকে প্রায় ২০ দিন ধরে একঘরে করে রাখার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন মাতাব্বরের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ওই পরিবারের সঙ্গে কেউ সামাজিক যোগাযোগ করলে কিংবা তাদের আয়-রোজগারের কাজে সহযোগিতা করলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ঘটনাটি উপজেলার হিলচিয়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর বেলভিডা দক্ষিণ সাতুঢা গ্রামের। ভুক্তভোগী পরিবারটি মৃত ভেলু মিয়ার দুই ছেলে মো. হবি মিয়া ও মো. রফিক মিয়ার পরিবার।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, তাদের প্রায় দেড় শতাংশ জমি নিয়ে প্রতিবেশী সেলিম ও শাহিনের সঙ্গে বিরোধ চলছে। সেলিম ও শাহিন দাবি করেন, ওই জমি তারা আগে কিছু টাকার বিনিময়ে কিনেছেন। তবে হবি ও রফিক মিয়ার পরিবার বলছে, তারা ওই জমি বিক্রি করেননি এবং এ বাবদ কোনো টাকা গ্রহণও করেননি।
এ নিয়ে স্থানীয় কয়েকজন মাতাব্বরের উদ্যোগে সালিশ বৈঠক বসে। সালিশে সেলিম ও শাহিন দাবি করেন, তারা পূর্বে ওই জমির জন্য টাকা দিয়েছেন। পরে সালিশকারীরা সিদ্ধান্ত দেন, সেলিম ও শাহিন হবি ও রফিক মিয়াকে দেড় লাখ টাকা দেবেন এবং বিনিময়ে তারা দেড় শতাংশ জমি ছেড়ে দেবেন। তবে ভুক্তভোগী পরিবার এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি।
পরিবারটির অভিযোগ, সালিশের সিদ্ধান্ত না মানায় অধু মিয়া, আবিরাজ মিয়া, কুদ্দুস, রিপন মিয়া (হিলচিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি), মন্নান ও রঙ্গু মিয়াসহ কয়েকজন মাতাব্বর তাদের একঘরে করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর এলাকাবাসীকে ওই পরিবারের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ না করার জন্য নিষেধ করা হয়।
ভুক্তভোগী মো. হবি মিয়া বলেন, তার গ্রামে একটি ধান ভাঙানোর রাইসমিল রয়েছে। সেখানে এলাকার কেউ ধান বা চাল ভাঙাতে গেলে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করার কথা বলা হয়েছে। এতে তার রাইসমিলে লোকজন আসতে ভয় পাচ্ছেন এবং ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
হবি মিয়া বলেন, “আমার রাইসমিলে এলাকার কেউ ধান-চাল ভাঙাতে আসলে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে বলে বলা হয়েছে। এ কারণে মানুষজন আর আসতে চায় না। আমি খুব সমস্যার মধ্যে আছি।”
হবি মিয়ার ছোট ভাই মো. রফিক মিয়া পেশায় অটোরিকশাচালক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমি গরিব মানুষ। অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাই। আমার অটোতে কেউ উঠলে তাকে ১০ হাজার টাকা এবং আমাকে কেউ অটোরিকশায় উঠালে তাকেও ১০ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছে। আমি পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলব?” এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের আরও অভিযোগ, সালিশকারীদের নির্দেশে তাদের স্তুপ করে রাখা গরুর খড় প্রতিবেশী দিলোয়ার হোসেন ভেঙে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে দিলোয়ার হোসেন বলেন, “তিন বছর ধরে নিষেধ করতাছি, খড়ের স্তুপ সরায় না। এখন সালিশিয়ানরা ভেঙে ফেলতে বলছে, তাই ভেঙে দিয়েছি। কারণ এটা আমার জায়গা।”তবে দিলোয়ার হোসেনের এ দাবির বিরোধিতা করে হবি মিয়া বলেন, “এটা রেকর্ডের রাস্তা। আমার বাড়ির ওপর দিয়ে রাস্তা যাওয়ায় আমি আমার জমির ওপর দিয়ে অন্যদিকে রাস্তা করে দিয়েছি। রেকর্ড অনুযায়ী জায়গাটি আমার।”
এ নিয়ে জমির মালিকানা ও রাস্তার জায়গা নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রায় ২০ দিন ধরে একঘরে থাকায় তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে তাদের আয়-রোজগারের পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা প্রশাসনের কাছে ঘটনার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং একঘরে করে রাখার সিদ্ধান্ত থেকে মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
রফিক মিয়া বলেন, “আমরা প্রশাসনের কাছে এর বিচার চাই। জমির বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হোক। আর আমাদের পরিবারকে একঘরে করে রাখার অবস্থা থেকে মুক্তি দেওয়া হোক।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত সেলিম ও শাহিনের বাড়িতে গিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। ফলে জমি বিক্রির দাবি ও সালিশের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে অভিযুক্ত সালিশকারীদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।