দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার মূল্যবান সরকারি খাস জমি নিয়ে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের জটিলতা। ভূমি জরিপের বিভিন্ন ধাপ, পুরোনো বন্দোবস্ত, কথিত ‘লুজ খতিয়ান’, ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ এবং দখল-বিক্রির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু লতাচাপলী মৌজাতেই এসএ জরিপের তুলনায় বিএস জরিপে সরকারি খাস জমি প্রায় ২ হাজার ৩৫ একর কমেছে। বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় এসব জমির মূল্য অন্তত চার হাজার কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী একটি ভূমিদস্যু চক্রের সঙ্গে ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস জমি ব্যক্তির নামে রেকর্ড, দখল ও বিক্রির প্রক্রিয়া চলেছে। এর কিছু অংশ বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছেও বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকার যেমন বিপুল সম্পত্তি হারানোর ঝুঁকিতে, তেমনি জমি কিনে বিনিয়োগকারীরাও ভবিষ্যৎ মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
তবে বিপুল পরিমাণ খাস জমি বিএস জরিপে কমে যাওয়ার বিষয়টি পূর্ববর্তী ও বর্তমান জরিপ রেকর্ড, মৌজা ম্যাপ, বন্দোবস্ত, নামজারি, দখল এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতার সমন্বয়ে দাগভিত্তিক যাচাই-বাছাই করা জরুরি প্রয়োজন মনে করে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মহা-পরিচালকের কাছে এক চিঠি দিয়েছেন। ২ সেপ্টেম্বর এই চিঠি প্রেরণ করেছেন। যেখানে তিনি কুয়াকাটা মাস্টার প্ল্যাান এলাকার মূল্যবান সরকারি খাস জমি ভুল বা অনিয়মিত রেকর্ডের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানায় চলে গিয়ে থাকলে তা সরকারি স্বার্থে ও পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য গুরুতর ঝুঁকির শঙ্কা তৈরি করবে বলে উল্লেখ করেছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, এসএ, আরএস, বিএস রেকর্ড ও মৌজা ম্যাপের দাগভিত্তিক সমন্বিত যাচাই করে সরকারি খাস জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ বা বিরোধপূর্ণ জমির ক্ষেত্রে রেকর্ড, ম্যাপ, বর্তমান দখল, স্থাপনা, বন্দোবস্ত কিংবা নামজারি, মামলা এসব ধারাবাহিকতায় যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। যাচাইয়ে সরকারি কোন খাস জমি অনিয়মি তবা প্রতারণামূলকভাবে ব্যক্তির নামে রেকর্ডভুক্ত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় রেকর্ডের ভিত্তিতে প্রচলিত আইন অনুসারে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়েরসহ সরকারি স্বত্ব সংরক্ষণ ও জমি পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা উল্লেখ করে অনুরোধ করা হয়েছে। কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
এক মৌজা ভেঙে পাঁচ মৌজা \
ভূমি অফিসসূত্রে জানা গেছে, একসময় জেএল ৩৪ নম্বর লতাচাপলী মৌজা নিয়েই গঠিত ছিল লতাচাপলী ইউনিয়ন ও বর্তমান কুয়াকাটা পর্যটন এলাকা। বর্তমানে এটি কুয়াকাটা, খাজুরা, আলীপুর, লতাচাপলী ও দক্ষিণ লতাচাপলী এই পাঁচ মৌজায় বিভক্ত। ভূমি সংশ্লিষ্ট নথি ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, আরএস জরিপের সময় নির্ধারিত সিলিংয়ের অতিরিক্ত জমি খাস করার ধারাবাহিকতায় এসএ জরিপে লতাচাপলী মৌজায় বিপুল পরিমাণ জমি সরকারি খাস হিসেবে রেকর্ড হয়।
এ মৌজায় এসএ জরিপের সর্বশেষ খতিয়ান নম্বর ছিল ১১৫৭। এরপর ১৯৪১ থেকে ১৯৫৪ সালের বিভিন্ন বন্দোবস্ত ও মিসকেসের বরাত দেখিয়ে ১১৫৮ নম্বর থেকে অন্তত দুই শ’ খতিয়ান খোলার অভিযোগ রয়েছে। এসব খতিয়ানের অনেকগুলোর মূল নথি ইউনিয়ন, উপজেলা ভূমি অফিস কিংবা জেলা প্রশাসকের এসএ শাখায় পাওয়া যায় না। স্থানীয়ভাবে এগুলো ‘লুজ খতিয়ান’ নামে পরিচিত। তাই এসব খতিয়ানের মালিকানা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।
খাস জমি ৫২৫৩ থেকে ৩২১৮ একর \
ভূমি সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এসএ জরিপে লতাচাপলী মৌজায় সরকারি খাস জমি ছিল প্রায় ৫ হাজার ২৫৩ একর। পরবর্তী বিএস জরিপে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ২১৮ একরে। অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৩৫ একর জমি খাস তালিকা থেকে বেরিয়ে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
২০০৫-০৬ সালে বিএস জরিপ চলাকালে মহিপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে এসব লুজ খতিয়ানের অনেকগুলো সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে বাতিলের বিরুদ্ধে আপিলও হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের রশিদ দেখিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে খতিয়ান বহাল রাখার পথ তৈরি করা হয়েছে। অথচ শুধু ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ সরকারি খাস জমির মালিকানা প্রমাণের বৈধ দলিল কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বন্দোবস্ত নিয়েও অগণিত অসংগতি
সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসীন সাদেক গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন, এখানকার পুরনো বন্দোবস্তের তথ্যের অসংগতি থাকার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্রিটিশ আমলে সৈনিকদের সর্বোচ্চ ১০ একর এবং পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২ থেকে ৭.৫০ একর পর্যন্ত জমি বন্দোবস্তের নজির থাকলেও ১৯৪১-৫৪ সালের বন্দোবস্তের বরাতে ২০, ৩০, ৫০, ৭০ এমনকি ১০০ একর জমি নিয়ে খতিয়ান সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে।
শুধু লতাচাপলী মৌজাতেই সরকারি খাস জমি উদ্ধারের উদ্যোগ হিসেবে ৮৮৮টি বন্দোবস্ত কেস শনাক্ত করা হয়েছে। গঙ্গামতি, কাউয়ার চর ও চাপলীসহ আশপাশের এলাকা মিলিয়ে মোট ১ হাজার ২৩৪টি বন্দোবস্ত কেস যাচাই-বাছাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
২০১১-২০১৩ সাল পর্যন্ত তদন্তের অগ্রগতি কোথায়?
বন্দোবস্তের অনিয়ম ও সরকারি জমি উদ্ধারের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ২০১১ সালে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), পটুয়াখালীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সন্দেহজনক বন্দোবস্ত যাচাই এবং সরকারি জমি উদ্ধারের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল কমিটির উদ্দেশ্য। কিন্তু এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্তের কার্যকর ফলাফল দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
লতাচাপলী মৌজার এমন একটি লুজ খতিয়ান ১৩৪৬ নম্বর। কুয়াকাটার প্রাণকেন্দ্রে এই জমির অবস্থান। এক শতক জমির মূল্য অন্তত পাঁচ লাখ টাকা। এই এসএ খতিয়ানের ৪ একর ৭৭ শতক জমিও বিভিন্ন ব্যক্তি দখল করে বর্তমানে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কথিত বন্দোবস্তের কাগজ দেখিয়ে এসব জমির মালিকানা দাবি করা হচ্ছে বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। ১৯৫২-৫৩ সালে এক ব্যক্তির নামে এই মূল্যবান জমি বন্দোবস্ত দেখানো হয়। অথচ ওই ব্যক্তির জন্মসাল অনুসারে তখন তার বয়স ছিল মাত্র আট বছর। তহশিলের তদন্ত প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এমন অসংখ্য খতিয়ানের সৃষ্টি থেকে নথিপত্র যাচাই করলেই খাস জমি হাতিয়ে নেওয়ার জালিয়াতির গল্প বেরিয়ে আসবে।
ঝুঁকিতে বিনিয়োগ
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কথিত লুজ খতিয়ানভুক্ত অনেক জমি বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সরকারি জমি বেহাতের পাশাপাশি এসব জমিতে বিনিয়োগ করা অর্থও ভবিষ্যতে ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মালিকানা নিয়ে মামলা, দখল বিরোধ ও উচ্ছেদ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরাম যুগ্ম আহ্বায়ক রুমান ইমতিয়াজ তুষার জানান, মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে কুয়াকাটার সঠিক উন্নয়নে সরকারি খাস জমি চিহ্নিত করে উদ্ধার করা জরুরি প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীতে এটি প্রথম কাজ বলে তিনি মনে করেন।
কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি মোতালেব শরীফ জানান, মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে এখানকার ব্যবসায়ীসহ সকল শ্রেণিপেশার মানুষের মতামত নিয়ে কুয়াকাটার টেকসই উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারি জমি আলাদাভাবে চিহ্নিত কওে সরকারের উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কলাপাড়া নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি স্থপতি ইয়াকুব খান বলেন, ‘ পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার উন্নয়নে মাস্টার প্লান বাস্তবায়নে প্রথমে প্রয়োজন ল্যান্ডজোনিং। পাশাপাশি সরকারের খাস জমি চিহ্নিত কওে তা উদ্ধাওে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তার মতে, কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের আগে এসএ, আরএস, বিএস ও বিআরএস রেকর্ড মিলিয়ে সরকারি খাস জমির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে ‘লুজ খতিয়ান’-এর উৎস, বৈধতা ও সৃজন প্রক্রিয়া তদন্ত করতে হবে।
ইয়াকুব খান মনে করেন, সরকারি জমি কীভাবে ব্যক্তি মালিকানায় গেল, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কোন নথির ভিত্তিতে রেকর্ড পরিবর্তন হয়েছে, তা বের করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত সরকারি জমি উদ্ধার করে কুয়াকাটার পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন উন্নয়নে ব্যবহার করতে হবে। সরকারি খাস জমির হিসাবের এই বড় ধরনের পরিবর্তনের নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তই পারে কুয়াকাটার ভূমি জটিলতার প্রকৃত চিত্র সামনে আনতে।