দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের নিপীড়নের অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। গত জুলাই ও আগস্ট মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসাশিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিশু শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। কোথাও শিক্ষক গ্রেপ্তার হয়েছেন, কোথাও মামলা হয়েছে, আবার কোনো ঘটনায় তদন্তও শুরু হয়েছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন হলেও একই ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসার বিষয়টি মাদ্রাসাগুলোতে শিশুদের নিরাপত্তা ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে জনমনে। সম্প্রতি সাভারের একটি মাদ্রাসায় সাত বছর বয়সী এক শিশুর ওপর দীর্ঘ সময় ধরে নিপীড়নের অভিযোগে ১০ জন ছাত্র ও শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটি প্রথমে নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর বিষয়টি জানালেও যথাযথ সুরক্ষা পায়নি। গত মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু শিক্ষার্থীর সঙ্গে অনৈতিক আচরণ ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। মাদ্রাসাগুলোর একটি বড় অংশ আবাসিক হওয়ায় সেখানে শিশুরা দীর্ঘ সময় শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকে। ফলে পরিবার থেকে দূরে থাকা এসব শিশুর নিরাপত্তার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক বেশি। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠানেই শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ, আবাসিক পরিবেশের নজরদারি এবং কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। ফলে দিন দিন এমন ঘৃণ্য অপরাধের সংখ্যা বেড়েই চলছে। শিশু নিপীড়নের ঘটনা শুধু একটি শিশুর শারীরিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তার মানসিক বিকাশ, শিক্ষাজীবন ও সামাজিক জীবনের ওপরও পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে অভিযোগ জানানোর পর শিশুটিকে বিশ্বাস করা হচ্ছেনা কিংবা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলোকেও আরও সক্রিয় হতে হবে। শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই, আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন, শিশুদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে ঘটে যাওয়া অপরাধের দায় দিয়ে পুরো মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, সেখানে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই ছাড় পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়। ধর্মীয় বা সাধারণ-যে ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই হোক, সেখানে শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব। তাই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেই কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।