একটি সংসারে স্ত্রী যখন স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করতে শুরু করেন, তখন পরিবারের মোট আয় বাড়ে, সন্তানের ভবিষ্যৎ আরও নিরাপদ করার সুযোগ তৈরি হয়, জীবনযাত্রার মানও উন্নত হতে পারে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু পারিবারিক বাস্তবতা সব সময় অর্থনীতির সরল হিসাব মেনে চলে না। কিছু ক্ষেত্রে স্ত্রীর আয় বাড়ার সঙ্গে স্বামীর অস্বস্তি, আত্মমর্যাদাবোধের সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা মানসিক চাপও দেখা দিতে পারে। প্রশ্ন হলো, এর কারণ কি সত্যিই স্ত্রীর বেশি আয়? নাকি এর পেছনে কাজ করে আরও গভীর কোনো সামাজিক ধারণা-যেখানে পুরুষকে পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী, দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের স্বাভাবিক কর্তৃত্বধারী হিসেবে দেখার অভ্যাস বহু প্রজন্ম ধরে গড়ে উঠেছে?
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এই প্রশ্নের উত্তরকে আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল করেছে। এখন আর বলা যায় না যে, স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করলেই পুরুষ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হন। বরং গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, অর্থের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে মর্যাদা, পারিবারিক দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং নারী-পুরুষের প্রচলিত সামাজিক ভূমিকার পরিবর্তন। অর্থাৎ স্ত্রী বেশি আয় করছেন-এটি একা কোনো সংকট নয়। সংকট তৈরি হতে পারে তখন, যখন সেই আয় পুরুষের বহুদিনের পরিচিত সামাজিক অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলে এবং পরিবার সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে না।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় ৫০০ বিবাহিত দম্পতির ওপর পরীক্ষামূলকভাবে দেখা হয়েছে, নারীর চাকরি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আসলে কোন বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি বাধা তৈরি করে। গবেষণাটি শুধু বেতন নিয়ে প্রশ্ন করেনি; চাকরিটির সামাজিক মর্যাদা, স্বামীর তুলনায় স্ত্রীর অবস্থান এবং চাকরির কারণে ঘরের কাজের বণ্টন কীভাবে বদলাবে-এসব বিষয়ও আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। ফলাফল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ: স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি সামাজিক মর্যাদার অবস্থানে চলে যাবেন-এমন চাকরি হলে ২৭ শতাংশ স্ত্রী এবং ৪৩ শতাংশ স্বামী তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আবার চাকরির কারণে ঘরের কাজের দায়িত্ব বদলে যেতে পারে-এমন পরিস্থিতিতে ৩৬ শতাংশ স্ত্রী এবং ৪৮ শতাংশ স্বামী চাকরিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। অথচ শুধু স্ত্রী বেশি আয় করবেন-এই কারণ দেখলে চাকরি প্রত্যাখ্যানের হার ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম: স্ত্রীদের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ এবং স্বামীদের ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ।
এই গবেষণার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই। এতদিন আমরা হয়তো ধরে নিয়েছি, স্ত্রী বেশি আয় করলে স্বামীর অস্বস্তির মূল কারণ স্ত্রীর উপার্জন। কিন্তু বাংলাদেশের এই পরীক্ষামূলক গবেষণা বলছে, স্ত্রীর উপার্জনের চেয়ে সামাজিক মর্যাদা এবং ঘরের দায়িত্বের পরিবর্তন অনেক বেশি শক্তিশালী বাধা হতে পারে। একজন নারী বেশি আয় করছেন-এটি হয়তো কোনো পরিবার মেনে নিতে পারে; কিন্তু তিনি যদি একই সঙ্গে স্বামীর চেয়ে বেশি মর্যাদার চাকরি করেন, সংসারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাঁর প্রভাব বাড়ে এবং ঘরের প্রচলিত দায়িত্বও পুনর্বণ্টনের প্রয়োজন হয়, তখন পুরোনো পারিবারিক সমীকরণে চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সমস্যাটি বেতন স্লিপে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি মানুষের মাথার ভেতরে তৈরি হয়ে থাকা ‘কে কোথায় থাকবে’-এই অদৃশ্য ধারণায়।
সমস্যা উপার্জনে নয়, বদলে যাওয়া পারিবারিক ক্ষমতার সমীকরণ
একজন পুরুষকে আমাদের সমাজ ছোটবেলা থেকেই এমন একটি ধারণার মধ্যে বড় করে তোলে যে, পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব মূলত তাঁরই-তাঁকে উপার্জন করতে হবে, স্ত্রী-সন্তানের দেখভাল করতে হবে এবং পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নেতৃত্ব দিতে হবে। এই দায়িত্ববোধ নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন পরিবারের জন্য আর্থিক দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের বিষয়টিও এক করে দেখা হয়। অর্থাৎ, ‘আমি বেশি আয় করি, তাই পরিবারের সিদ্ধান্তেও আমার কথার গুরুত্ব বেশি’-এই ধারণা যখন সামাজিক প্রত্যাশায় পরিণত হয়, তখন স্ত্রীর আয় বেড়ে যাওয়া শুধু পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন থাকে না; তা পরিবারের ভেতরে দীর্ঘদিনের ভূমিকা ও ক্ষমতার সমীকরণকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
এ কারণেই কোনো কোনো পুরুষ স্ত্রীর বেশি আয়কে পরিবারের সম্মিলিত সাফল্য হিসেবে দেখার বদলে নিজের অবস্থানের জন্য অস্বস্তিকর পরিবর্তন হিসেবে অনুভব করতে পারেন। সামাজিক অনুষ্ঠান, আত্মীয়স্বজনের মন্তব্য কিংবা বন্ধুমহলের তুলনাও সেই অস্বস্তিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। ‘স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করেন’-অনেক সমাজে এটি নিছক একটি অর্থনৈতিক তথ্য নয়; এর সঙ্গে পুরুষের সামর্থ্য, মর্যাদা এবং পারিবারিক ভূমিকা সম্পর্কে নানা অলিখিত ধারণা জড়িয়ে থাকে। তবে এই অস্বস্তিকে বোঝার চেষ্টা মানে স্ত্রীর ওপর নিয়ন্ত্রণকে বৈধতা দেওয়া নয়। স্বামী কম আয় করছেন বলে স্ত্রীকে চাকরি ছাড়তে বলা যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি স্ত্রী বেশি আয় করছেন বলে স্বামীকে ছোট করাও সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর। একটি সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি কে বেশি আয় করেন, তার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ নয়; বরং আয়, শ্রম, সময় ও পারিবারিক দায়িত্ব কীভাবে ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণাটিও আমাদের ঠিক এই জায়গাটির দিকে নিয়ে যায়। গবেষকেরা দেখেছেন, নারীর চাকরির ক্ষেত্রে শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, সামাজিক মর্যাদা এবং ঘরের কাজের সম্ভাব্য পরিবর্তনও দম্পতির সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ একজন নারী কাজ করবেন কি না-এই সিদ্ধান্তকে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ বা সম্ভাব্য আয়ের প্রশ্ন হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না। একজনের কর্মজীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে অন্যজনের সময়, দায়িত্ব ও পারিবারিক ভূমিকারও পরিবর্তন হতে পারে। ফলে নারীর অর্থনৈতিক অগ্রগতি অনেক সময় শুধু একজন ব্যক্তির কর্মজীবনের পরিবর্তন নয়; তা পুরো পরিবারের প্রচলিত ভূমিকা ও দায়িত্বের কাঠামোকেও নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি করে।
স্ত্রী বেশি আয় করলে পুরুষের অস্বস্তি কেন তৈরি হয়
স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করলে বিষয়টি শুধু পরিবারের আয় বাড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বদলে যেতে পারে পরিবারে প্রচলিত ভূমিকা ও প্রত্যাশার সমীকরণও। যে সমাজে পুরুষকে প্রধান উপার্জনকারী হিসেবে দেখার প্রবণতা রয়েছে, সেখানে স্ত্রীর বেশি আয় কখনো কখনো স্বামীর নিজের সামাজিক পরিচয় ও পারিবারিক ভূমিকা নিয়ে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তবে এই অস্বস্তিকে কেবল ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক দায়িত্বের বণ্টন এবং দীর্ঘদিনের নারী-পুরুষের ভূমিকা সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা।
জাপানের দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক তথ্য নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, স্ত্রী স্বামীর সমান বা তার চেয়ে বেশি আয় করার সম্ভাবনা তৈরি হলে নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণে ভিন্ন প্রবণতা দেখা দিতে পারে। আবার স্ত্রী পরিবারের আয়ের বড় অংশ অর্জন করলেও ঘরের কাজ ও সন্তান দেখাশোনায় তাঁর অংশগ্রহণ কিছু ক্ষেত্রে কমার বদলে বাড়তে পারে। অর্থাৎ কর্মক্ষেত্রে আয় বাড়লেও ঘরের প্রচলিত দায়িত্ব একইভাবে থেকে যেতে পারে। জার্মানির গবেষণায় আবার স্ত্রী স্বামীর চেয়ে সামান্য বেশি আয় করেন-এমন দম্পতিদের মধ্যে স্বামীদের জীবন, কাজ ও স্বাস্থ্য নিয়ে সন্তুষ্টি কমার কিছু সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নারীদের ক্ষেত্রেও কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে।
অস্ট্রেলিয়ার আরও সাম্প্রতিক গবেষণায় বিষয়টি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার তথ্য দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। সেখানে স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করার পর পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে, বিশেষ করে পরিবর্তনটি দীর্ঘস্থায়ী হলে। তবে এসব গবেষণা থেকে এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না যে, স্ত্রীর বেশি আয় সরাসরি পুরুষের মানসিক সমস্যার কারণ। গবেষণাগুলোর সামাজিক প্রেক্ষাপট ও পদ্ধতি ভিন্ন; বরং এগুলো ইঙ্গিত করে যে অর্থনৈতিক ভূমিকার পরিবর্তনের সঙ্গে সামাজিক প্রত্যাশা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সংঘাতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সুতরাং স্ত্রী বেশি আয় করলে যে পরিবর্তনটি ঘটে, তা শুধু পরিবারের ব্যাংক হিসাবে দেখা যায় না; এর প্রভাব পড়তে পারে সময়ের বণ্টন, ঘরের দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভূমিকার ওপর। সংকটটি তাই স্ত্রীর বেশি আয় করার মধ্যে নয়। সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে তখনই, যখন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোনো পারিবারিক ভূমিকা ও প্রত্যাশার সংঘাত তৈরি হয়।
জাপান-জার্মানি-অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতা কী বলছে?
জাপান, জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষণাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়-স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করলে পরিবর্তনটি শুধু পারিবারিক আয়ের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়তে পারে দাম্পত্য সম্পর্ক, পারিবারিক দায়িত্ব এবং নারী-পুরুষের প্রচলিত ভূমিকার ওপরও। জাপানে দেখা গেছে, স্ত্রীর সম্ভাব্য বেশি আয় এবং ঘরের কাজের প্রচলিত দায়িত্ব নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকে প্রভাবিত করতে পারে। জার্মানিতে স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করেন-এমন পরিবারে উভয়ের জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে সন্তুষ্টির কিছু নেতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় আবার এমন আয়-ভূমিকার পরিবর্তনের পর পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে, বিশেষ করে পরিবর্তনটি দীর্ঘস্থায়ী হলে। তবে তিন দেশের গবেষণার পদ্ধতি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট এক নয়; তাই এগুলোকে সরাসরি কারণ-ফলাফলের সম্পর্ক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং একটি প্রশ্ন সামনে আসে-অর্থনৈতিক ভূমিকা বদলালেও সামাজিক ভূমিকার পুরোনো ধারণা কি একই গতিতে বদলায়?
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, নারী-পুরুষের কাজ ও পারিবারিক ভূমিকা নিয়ে প্রচলিত সামাজিক ধারণা এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হলে পুরুষের চাকরির অধিকার নারীর চেয়ে বেশি-এমন ধারণা যেমন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষের মধ্যে রয়েছে, তেমনি স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি আয় করলে পারিবারিক সমস্যা হতে পারে-এমন বিশ্বাসও বিস্তৃত। ফলে একজন নারী কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে গেলে পরিবর্তনটি শুধু তাঁর আয় বা পেশাগত অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিবারের ভেতরে দীর্ঘদিনের ভূমিকা ও প্রত্যাশার সঙ্গেও সংঘাতে যেতে পারে।
এই সংঘাতের প্রভাব পুরুষের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। যে সমাজে পুরুষের সাফল্যকে দীর্ঘদিন ধরে উপার্জন ও পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, সেখানে স্ত্রী বেশি আয় করলে কারও কারও মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে স্ত্রীর অগ্রগতি থামাতে হবে। বরং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পারিবারিক দায়িত্বের ধারণাকেও নতুন করে ভাবতে হবে। পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া মানেই সবচেয়ে বেশি আয় করা নয়; সন্তান লালন-পালন, ঘরের কাজ ভাগ করে নেওয়া, সঙ্গীর পেশাগত অগ্রগতিকে সমর্থন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্বের ভারসাম্য বদলে নেওয়াও তার অংশ।
একইভাবে, নারীর অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেও শুধু আয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। স্ত্রী বেশি আয় করছেন বলে তাঁর মতামত ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব বাড়তে পারে, কিন্তু সেটি স্বামীর অবদানকে অস্বীকার করার কারণ নয়। একটি পরিবারে আয়, শ্রম, সময় ও দায়িত্ব-সবই পারিবারিক সম্পদের অংশ। তাই প্রশ্নটি কে বেশি আয় করছেন, সেখানে থেমে না থেকে বরং দুজনের পরিবর্তিত ভূমিকা পরিবার কীভাবে গ্রহণ করছে, সেদিকেই তাকানো প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত জাপান, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া এবং বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা হলো-সংকটটি স্ত্রীর বেশি আয় করার মধ্যে নয়; সংকট তৈরি হতে পারে যখন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোনো পারিবারিক ভূমিকা ও সামাজিক প্রত্যাশার সংঘাত ঘটে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা: আয় বাড়লেই হবে না, বদলাতে হবে মানসিকতাও
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় সুযোগ-নারীর শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বাড়ছে, অর্থনীতিতে নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে, প্রযুক্তি ঘরে বসে কাজের সুযোগও বাড়াচ্ছে। কিন্তু শুধু নারীর হাতে চাকরি তুলে দিলেই কাজ শেষ হবে না। দেখতে হবে, সেই চাকরির সঙ্গে ঘরের দায়িত্বের কী পরিবর্তন হচ্ছে। স্ত্রী কর্মজীবী হলেন, আয়ও বাড়ল; কিন্তু সন্তান, রান্না, পরিবারের দেখাশোনা ও দৈনন্দিন গৃহস্থালির বড় অংশ যদি আগের মতোই তাঁর ওপর থাকে, তাহলে কর্মসংস্থান বাড়লেও সমতা বাড়ে না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই-নারীর কাজের সিদ্ধান্তে শুধু আয় নয়, সামাজিক মর্যাদা এবং ঘরের দায়িত্ব বদলে যাওয়ার আশঙ্কাও বড় ভূমিকা রাখে। তাই নারীর কর্মসংস্থানকে শুধু অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে না দেখে পরিবার ও সমাজের পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।
এই পরিবর্তনে পুরুষের ভূমিকাও নতুন করে ভাবতে হবে। স্ত্রী স্বামীর চেয়ে কম আয় করলে তিনি ‘দায়িত্বশীল’, আর বেশি আয় করলে তাঁর আত্মসম্মান ক্ষুণ্ন-এমন ধারণা কোনো সুস্থ পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে না। একজন পুরুষের মূল্য তাঁর উপার্জনের অঙ্কে নয়; পরিবারের প্রতি তাঁর দায়িত্ব, সন্তান পালনে অংশগ্রহণ, সঙ্গীর কর্মজীবনের প্রতি সম্মান এবং প্রয়োজনের সময় দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেও তাঁর অবদান রয়েছে। একইভাবে স্ত্রীর বেশি আয়ও তাঁকে স্বামীর ওপর কর্তৃত্বের অধিকার দেয় না। আয়কে প্রতিযোগিতার মাপকাঠি না বানিয়ে পারিবারিক সম্পদ হিসেবে দেখতে পারলেই সম্পর্কের টানাপোড়েন অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এ জন্য নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। কর্মজীবী বাবা-মায়ের জন্য শিশুযত্নের ব্যবস্থা, নমনীয় কর্মঘণ্টা, ঘরের কাজে পুরুষের অংশগ্রহণকে স্বাভাবিক করে তোলা এবং দম্পতির যৌথ আর্থিক সিদ্ধান্তের সংস্কৃতি-এসবকে নারীর কল্যাণের আলাদা বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এগুলো একটি আধুনিক অর্থনীতির প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। একই সঙ্গে পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও আরও স্বাভাবিক আলোচনা দরকার। স্ত্রীর তুলনায় কম আয় করা বা প্রচলিত ‘উপার্জনকারী পুরুষ’ পরিচয় থেকে সরে আসাকে ব্যর্থতা হিসেবে না দেখে জীবনের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
শেষ পর্যন্ত সংসারের প্রশ্নটি কে বেশি আয় করেন, তা নয়; বরং সেই আয় ও দায়িত্ব কীভাবে দুজন মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে। স্ত্রী এক লাখ টাকা এবং স্বামী আশি হাজার টাকা আয় করলে সেখানে কেউ জিতলেন আর কেউ হারলেন-এমন হিসাবের কোনো অর্থ নেই। আবার স্বামী বেশি আয় করলেও স্ত্রীর ঘরের শ্রম ও সন্তান পালনের অবদানকে কম মূল্য দেওয়ার সুযোগ নেই। পরিবার কোনো ক্ষমতার প্রতিযোগিতার জায়গা নয়; এটি অংশীদারিত্বের জায়গা। সেই অংশীদারিত্বে একজনের সাফল্য অন্যজনের ব্যর্থতা হয়ে উঠলে সমস্যা অর্থে নয়, মানসিকতায়।
বাংলাদেশ যদি তার মানবসম্পদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চায়, তাহলে নারীর কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি পুরুষের সামাজিক ভূমিকাকেও সময়ের সঙ্গে বদলাতে হবে। স্ত্রী বেশি আয় করছেন-এটি কোনো পরিবারের সংকটের কারণ হওয়ার কথা নয়। সংকট তখনই, যখন আমরা এখনও মনে করি পরিবারের মর্যাদা, কর্তৃত্ব কিংবা পুরুষের মূল্য নির্ধারিত হবে কে কত আয় করছেন তার ওপর।
সংসারে শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্নটি ‘কে বেশি আয় করেন’ নয়; ‘কে কাকে কতটা সম্মান করেন’-সেটিই।
লেখক : সংগ্রাহক ও গবেষক