পিএইচডি ডিগ্রি পেলেন জেলা ও দায়রা জজ তাজুল ইসলাম

এফএনএস (ফারুক আহমেদ; মেহেরপুর) : | প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
পিএইচডি ডিগ্রি পেলেন জেলা ও দায়রা জজ তাজুল ইসলাম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধীনে পিএইচডি (ডক্টর অব ফিলোসফি) ডিগ্রি অর্জন করেছেন বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) মো. তাজুল ইসলাম। গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে এ ডিগ্রি প্রদান করা হয়।
ড. মো. তাজুল ইসলামের গবেষণার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশে মান্ধাতা আমলের ফৌজদারী বিচার ব্যবস্থা: বিকল্পের সন্ধানে’। গবেষণাটির ইংরেজি শিরোনাম ‘অৎপযধরপ ছঁধহফধৎু ড়ভ ঈৎরসরহধষ ঔঁংঃরপব ঝুংঃবস রহ ইধহমষধফবংয: ছঁবংঃ ভড়ৎ ঃযব অষঃবৎহধঃরাব’।
গবেষণায় বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত পুরোনো আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিকল্প ও সংস্কারের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ আমলে প্রণীত প্রায় দুই শতাব্দী পুরোনো আইনগুলোকে বর্তমান সময়ের বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক ‘বেস্ট প্র্যাকটিস’-এর সঙ্গে সমন্বয় করে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের মাধ্যমে দেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনার সম্ভাবনা গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণার মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা-ভোসে) দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা গবেষণাকর্মটির বিষয়বস্তু, বিশ্লেষণ ও প্রাসঙ্গিকতার প্রশংসা করেন বলে জানা গেছে।
পিএইচডি অর্জনের প্রতিক্রিয়ায় ড. মো. তাজুল ইসলাম মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন। একই সঙ্গে তাঁর শিক্ষক, গবেষক দল ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে গবেষণালব্ধ জ্ঞান দেশের কল্যাণ ও বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে কাজে লাগানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি। বর্তমানে ড. মো. তাজুল ইসলাম মেহেরপুর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৮৪ সালের ৩১ জানুয়ারি সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার কুশোডাঙ্গা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ২০০০ সালে এসএসসি এবং ২০০২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে ২০০৬ সালে এলএলবি (অনার্স) এবং ২০০৭ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড ক্রিমিনাল জাস্টিস বিভাগ থেকে মাস্টার্স এবং উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ থেকে বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করেন।
তৃতীয় বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৮ সালে সহকারী জজ হিসেবে খুলনা জেলা জজশিপে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর বিচারিক কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ঢাকায় এবং যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে ঠাকুরগাঁও, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহ জেলা জজশিপে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কুষ্টিয়া ও যশোর জেলা জজশিপে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
বিচারিক দায়িত্ব পালনের বিভিন্ন পর্যায়ে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও মামলাজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছেন। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২২ সালে ৫৫টি হত্যা মামলা নিষ্পত্তি করে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি।
বিচারিক কর্মজীবনের পাশাপাশি আইন ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করে আসছেন ড. মো. তাজুল ইসলাম। মামলাজটমুক্ত ও কার্যকর বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিচারপ্রার্থী মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাকে তিনি অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন।
আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিচারব্যবস্থা, বিচারিক সংস্কার ও মামলাজট নিরসনের বিষয়ে আগ্রহ তৈরিতেও তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ড. মো. তাজুল ইসলাম আইন গবেষক ও কলামিস্ট হিসেবেও পরিচিত। সমসাময়িক আইন, বিচারব্যবস্থা ও বিচারিক সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন।
তাঁর লেখা ‘সাংবিধানিক আইনের সহজপাঠ’, শিশু আইনবিষয়ক ‘ঔাঁবহরষব উবষরহয়ঁবহপু রহ ইধহমষধফবংয: ওফবহঃরভুরহম ঃযব ঈধঁংবং রিঃয চৎবাবহঃরড়হ ধহফ জবযধনরষরঃধঃরড়হ’ এবং ‘বাংলাদেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা: স্বাধীনতার ৫০ বছর’-এই তিনটি বই ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। শিশু আইনবিষয়ক তাঁর বইটি বিশ্বের নয়টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে ড. মো. তাজুল ইসলাম বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী ফেরদৌসী আক্তার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার ইংরেজি বিভাগে সহকারী অধ্যাপিকা হিসেবে কর্মরত। তাঁদের দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে। সাত ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। তাঁর বাবা আবুল হোসেন ছিলেন অধ্যাপক (অব.) এবং মা জামিলা বেগম ছিলেন গৃহিণী। বিচারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি গবেষণা ও লেখালেখির মাধ্যমে দেশের বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন, মামলাজট নিরসন এবং বিচারপ্রার্থী মানুষের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার যে প্রচেষ্টা ড. মো. তাজুল ইসলাম চালিয়ে যাচ্ছেন, পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন তাঁর সেই পথচলাকে আরও সমৃদ্ধ ও বেগবান করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আপনার জেলার সংবাদ পড়তে