লম্বা সময় লোডশেডিংয়ের কারণে নষ্ট হচ্ছে দেশের হিমাগারগুলোতে মজুদ করা আলু। তাতে শঙ্কিত হয়ে পড়েছে আলু মজুদকারী কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কারণ বর্তমানে হিমাগারের আলুতে অসময়ে গেজ হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাতে কমে যাবে আলুর দাম। এবার মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি ভেজা আলু হিমাগারে রাখার কারণে এখন বাছাই করে বাজারজাত করতে গিয়ে বস্তাপ্রতি পচা বের হচ্ছে ৫ থেকে ৭ কেজি। তাতে ব্যাপক লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। মুন্সীগঞ্জে মোট ৬৪টি হিমাগারের মধ্যে বর্তমানে সচল ৬১টি। ওসব হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু ওসব হিমাগারে এবার চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাছাড়া উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও অতিরিক্ত আলু হিমাগারগুলোতে রাখা হয়েছে। হিমাগারে আলুর বস্তা রাখতে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। তাতে কেজিতে ২২ থেকে ২৩ টাকা খরচ হলেও এখন তা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। কারণ আলুর দাম আরো কমার আশঙ্কা রয়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ী এবং হিমাগার সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত কয়েক বছর ধরেই দেশে চাহিদার বেশি আলু উৎপাদন হচ্ছে। সেজন্য প্রতি বছরই ক্রমাগত লোকসান গুনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষকরা। কিন্তু সরকার উৎপাদন আলু রফতানির তেমন উদ্যোগ নিচ্ছে না। ফলে হিমাগারে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সেজন্য রাজশাহীর ৩৯টি হিমাগারের সবটিতেই আলু কম-বেশি পচন ধরেছে। প্রতি বস্তাতেই ৫-১০ কেজি বা কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি পচা আলু মিলছে। অথচ এমনিতেই খরচের চেয়ে আলুর বাজার মূল্য কম। তার ওপর পচার কারণে আরো বাড়তি লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
সূত্র জানায়, হিমাগারে সংরক্ষণের পরে আলুর বস্তার ৬ বার জায়গা পরিবর্তন করতে হয়। আর একবার জায়গা পরিবর্তন করতে প্রতিটি স্টোরের খরচ হয় কমপক্ষে ১৫ লাখ টাকা। কিন্তু হিমাগার কর্তৃপক্ষ এক থেকে দুইবার পর্যন্ত ওই পরিবর্তন কম করেছে। তাতে তাদের ১৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়। কিন্তু আলুতে সঠিকভাবে ঠাণ্ডা বাতাস পায় না। তাছাড়া প্রতি তিন লাইন পর পর তিন ফিট করে ফাঁকা রাখার কথা থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ লাইন পর পর তিন ফিট ফাঁকা রাখা হয়েছে। মূলত অতিরিক্ত আলু সংরক্ষণের কারণে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া সাত ফিট ওপরে অন্তত দুই থেকে তিন হাত ফাঁকা রাখার কথা। যেন ঠিকমতো বাতাস চলাচল করতে পারে। সেখানেও সামান্য পরিমাণে ফাঁকা রাখা হয়েছে। ওসব কারণে হিমাগারগুলোতে সংরক্ষিত আলুতে পচন ধরেছে।
সূত্র আরো জানায়, হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমানো এবং হিমাগার মালিকদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ার দাবিতে আলু চাষি ও ব্যবসায়ীরা রংপুরে বিক্ষোভ করেছে। তারা মহাসড়কে আলু ঢেলে বিক্ষোভ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও, সাদা কাফন পরে অনশন কর্মসূচির পর সর্বশেষ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে। চাষিরা বলছেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে আলুর দাম কম। তার মধ্যে হিমাগারে সংরক্ষণ ভাড়া বেশি হওয়ায় তাদের লোকসান আরো বাড়ছে। বর্তমানে হিমাগারগুলোতে কেজিপ্রতি প্রায় ৬ টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়া নেয়া হচ্ছে। ভাড়া কমিয়ে পাঁচ টাকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করে কৃষকের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা জরুরি। সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে ১৬ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। অথচ বর্তমানে হিমাগার পর্যায়ে আলুর দাম ১৫ থেকে ১৬ টাকা। ফলে সংরক্ষণ ভাড়া বেশি হলে কৃষকের লোকসান আরো বাড়বে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক এন এম আলমগীর বাদশা জানান, কৃষকদের দাবির প্রেক্ষিতে কেজিপ্রতি ৫ টাকা ভাড়া নির্ধারণের প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। তবে হিমাগার মালিকদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা বা সম্মতি পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে রংপুর চেম্বারের পরিচালক শরিফুল ইসলাম বাবু জানান, হিমাগারের ভাড়া নির্ধারণে সরকার, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, হিমাগার মালিক, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। যাতে তাঁদের সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতেই যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণ করা যায়।