ব্যাংকিং খাতের মতো দেশের বিমা খাতেও ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গ্রাহকের বিমা দাবি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে হলেও পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে বলে সতর্ক করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সব বিমা কোম্পানিকে অটোমেশন ও অনলাইন লেনদেনের আওতায় আনার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের প্রায় ৫৭ শতাংশ বিমা দাবি অপরিশোধিত রয়েছে। অর্থাৎ, ১০০টি দাবির মধ্যে ৫৭টিরই নিষ্পত্তি হয়নি। গ্রাহকের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত না দিয়ে কোনো কোনো বিমা কোম্পানি নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আমির খসরু বলেন, গ্রাহকদের বিমা দাবি পরিশোধের জন্য কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। ওই সময়ের মধ্যে দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হলে কোম্পানির সম্পত্তি বিক্রি করে জনগণের পাওনা পরিশোধ করা হবে।
তিনি বলেন, “যে মানুষটা নিরাপত্তার জন্য ইন্স্যুরেন্স করে, নিজের কষ্টের অর্জিত টাকা থেকে দেয়, তাকে আপনি কীভাবে সেই টাকা থেকে বঞ্চিত করবেন?”
অর্থমন্ত্রী বলেন, গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করাই বিমা খাতে আস্থা ফেরানোর অন্যতম শর্ত। যারা দাবি পরিশোধ করছে, তাদের বিষয়ে ইতিবাচক ব্যবস্থা থাকবে। আর যারা পরিশোধ করছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিমা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, “অনিয়ন্ত্রণ, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি এত গভীরে এটা কঠিন কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে কঠিন কাজটিই করতে হবে।”
অটোমেশন ও অনলাইন লেনদেনে জোর
বিমা খাতে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে সব কোম্পানিকে অটোমেশনের আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। একই সঙ্গে সব ধরনের লেনদেন অনলাইনে করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
আমির খসরু বলেন, যত বেশি শারীরিক যোগাযোগ থাকবে, দুর্নীতির সুযোগ তত বেশি থাকবে। তাই বিমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা না মানলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি। আর্থিক লেনদেন ও কোম্পানির কার্যক্রমে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সব ধরনের কমপ্লায়েন্স মানার নির্দেশ দেওয়া হবে।
দুই সার্ভার ব্যবহারে কড়াকড়ি
কিছু বিমা কোম্পানির দুটি সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগ নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্য, কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি সার্ভারে প্রকৃত তথ্য এবং অন্যটিতে ভিন্ন ধরনের লেনদেন সংরক্ষণের মতো ঘটনা পাওয়া গেছে।
এখন থেকে কোনো বিমা কোম্পানিতে দুই সার্ভার রাখা যাবে না বলে জানান তিনি। নির্ধারিত সময়ের পর কোম্পানিগুলোতে পরিদর্শন শুরু হবে। এ সময় কোনো প্রতিষ্ঠানে দুই সার্ভার ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাত থেকে আট কোম্পানির অবস্থা উদ্বেগজনক
বিমা খাতের সাত থেকে আটটি কোম্পানির অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে এখনো কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেটিও চিন্তার বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা মেনে এসব কোম্পানিকে স্বল্প সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধানের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। যারা তা করতে পারবে না, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোনো বিমা কোম্পানিকে একীভূত করার বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত জানাতে চাননি অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর জন্য যা প্রয়োজন, সেটিই করা হবে। বিষয়গুলো প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত আগেভাগে এ বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
আইডিআরএতে নিজস্ব জনবল গড়ার পরিকল্পনা
আইডিআরএর জনবল সংকটের পাশাপাশি দক্ষ ও পেশাদার কর্মীর ঘাটতির কথাও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রেষণে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের সংখ্যা কমিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নিজস্ব জনবল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, এসব কর্মীকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ ও পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলা হবে। বিমা একটি বিশেষায়িত পেশা হওয়ায় এ বিষয়ে পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের আইডিআরএর সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।
আইনেও পরিবর্তনের উদ্যোগ
বিমা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিতে পরিবর্তন আনার কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ব্যাংকিং খাতের মতো বিমা খাতেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ-সংক্রান্ত পরিবর্তন পরবর্তী সময়ে সংসদে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিভিন্ন মামলা ও আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সমস্যা হচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তার মতে, কেউ কেউ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্ত এড়াতে আদালতের আশ্রয় নিয়ে সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ সমস্যা সমাধানেও বিমা আইনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি আইডিআরএর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার কথা ভাবা হচ্ছে।
বিশ্বমানের বিমা খাত গড়ার লক্ষ্য
বাংলাদেশের বিমা খাতকে আন্তর্জাতিক মানে নেওয়ার লক্ষ্য তুলে ধরেন আমির খসরু। তিনি বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিমা কোম্পানির বড় ভূমিকা থাকতে পারে। জীবন বিমার পাশাপাশি মানুষের সম্পদ, ব্যবসা, বাড়িঘর, আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক পণ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিমার পরিধি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তার মতে, বাংলাদেশে বিমার সেই সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ, কঠোর তদারকি, অটোমেশন এবং পেশাদার জনবল তৈরির মাধ্যমে খাতটিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কার্যকরভাবে কাজ শুরু করলে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের পক্ষ থেকে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দুর্বল করে আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে চাইতে পারে। তবে সেই সুযোগ আর দেওয়া হবে না।
তার ভাষায়, “ওই দরজা আমরা বন্ধ করে দিয়েছি।”
এখন থেকে বিমা কোম্পানিগুলোকে আইন মেনে, নিয়ন্ত্রিতভাবে, পেশাদারত্বের সঙ্গে এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় কাজ করতে হবে বলেও স্পষ্ট করেন অর্থমন্ত্রী।