ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সামরিক প্রস্তুতি ও ইউরোপে সম্ভাব্য ‘হাইব্রিড হামলা’ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও ইউরোপীয় নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে রাশিয়ার সম্ভাব্য সেনা নিয়োগ, সাইবার হামলা, নাশকতা ও ড্রোন হামলার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। তবে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কোনো বড় আকারের সেনা সমাবেশের পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর প্রকাশ্য গণনিয়োগের পরিবর্তে ধাপে ধাপে সেনা বাড়ানোর একটি ‘গোপন সেনা সমাবেশ’ বা ‘স্টেলথ মোবিলাইজেশন’ হতে পারে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তারা ধারণা করছেন।
এর আগে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেছিলেন, সেপ্টেম্বরের নির্বাচনের পর রাশিয়া আরও তিন লাখ সেনা নিয়োগের পরিকল্পনা করছে। ইউক্রেনের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে মোট ছয় লাখ সেনা নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও দাবি করে। তবে এসব দাবির বিষয়ে রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নতুন গণনিয়োগ পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের মতে, বিপুলসংখ্যক সেনাকে দ্রুত যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর মতো সামরিক সরঞ্জাম রাশিয়ার হাতে আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাই একসঙ্গে বড় আকারে সেনা নিয়োগের বদলে চুক্তিভিত্তিক সেনা বাড়ানোসহ ধাপে ধাপে জনবল বৃদ্ধির চেষ্টা হতে পারে বলে তাদের ধারণা।
এর পাশাপাশি ইউক্রেনের বাইরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাশিয়ার সম্ভাব্য ‘হাইব্রিড হামলা’ নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সাইবার হামলা, নাশকতা, ড্রোন হামলা, তথ্যযুদ্ধ ও অন্যান্য গোপন তৎপরতা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ শুক্রবার বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউরোপ ও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে রুশ ‘হাইব্রিড হুমকি’ বেড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি স্থাপনা সুরক্ষায় পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
ম্যাক্রোঁর ভাষ্য, এসব তৎপরতার উদ্দেশ্য ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় সমর্থন দুর্বল করা ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে ভয় দেখানো। তিনি আরও বলেছেন, রাশিয়ার এ ধরনের হামলা হলে তা জবাবহীন থাকবে না।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কও রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা নিয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ড্রোন ও রকেট ব্যবহার করে ‘হাইব্রিড হামলা’ চালানোর পরিকল্পনা থাকতে পারে রাশিয়ার। সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর মধ্যে পোল্যান্ডও রয়েছে বলে জানান তিনি।
টাস্কের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব হামলাকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হতে পারে, যাতে ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া দুর্বল হয়। তিনি আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধের আগামী মাসগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের মধ্যেও উত্তেজনা রয়েছে। ইউক্রেনকে দূরপাল্লার হামলায় সহায়তা করা হলে সেখানে থাকা ব্রিটিশ সামরিক স্থাপনাগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে মস্কো সতর্ক করেছে। অন্যদিকে ব্রিটিশ পক্ষ এ ধরনের পদক্ষেপকে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকা থেকে দৃষ্টি সরানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছে।
সব মিলিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে রাশিয়া ইউরোপে বড় ধরনের নতুন হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি; বর্তমান আশঙ্কাগুলো মূলত পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়ন ও ইউরোপীয় নেতাদের সতর্কবার্তার ওপর ভিত্তি করে তৈরি।