জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে আজ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ভোরে নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ বিতর্ক পর্বে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। সফরে চার মন্ত্রীসহ ৩৫ জন প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী থাকবেন।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথিতেও নিউইয়র্ক সফরসংক্রান্ত সরকারি আদেশ প্রকাশের তথ্য পাওয়া গেছে।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয় তুলে ধরবেন।
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্বের বলে উল্লেখ করেন আসাদ আলম সিয়াম। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান সরকারের জন্য জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বৈশ্বিক মঞ্চে এটিই প্রথম অংশগ্রহণ। এর মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে থাকছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। এছাড়া দুই রাজনৈতিক দলের নেতাও সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন। তাঁরা হলেন বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব গোলাম মহিউদ্দিন।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। একই অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ কারণে সফরটি বাংলাদেশের জন্য বিশেষ মর্যাদার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নিউইয়র্কে পৌঁছানোর পর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে। সকালে জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের স্বাগত প্রাতঃরাশে অংশ নেবেন তিনি। এরপর অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে যোগ দেবেন। সন্ধ্যায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট আয়োজিত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সম্মানে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
২৩ সেপ্টেম্বর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতব্য ও মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেন আয়োজিত বৈশ্বিক বৈষম্য সংকট মোকাবিলা বিষয়ক সভায় বক্তব্য দেবেন। বিকেলে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের সভায় যোগ দেবেন তিনি।
২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি মোকাবিলা বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সেখানে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, লস অ্যান্ড ড্যামেজ এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন তিনি।
একই দিন বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক পর্বে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। ২০২৬ সালের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৪ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার।
সফরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আয়োজিত দুটি সাইড ইভেন্টেও অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক সাইড ইভেন্টে তিনি রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চাইবেন।
২৪ সেপ্টেম্বর মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক আরেকটি সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেবেন তিনি। সেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত ধাত্রীসেবার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
সফরের ফাঁকে কয়েকটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স, ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্র সচিব। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় আলোচনায় আসতে পারে।
এছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার এবং ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবেও একাধিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। ওয়াল স্ট্রিট ও মেটাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা, দক্ষতা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের বিষয় গুরুত্ব পাবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎ হবে কি না, সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বহুপক্ষীয় সফরের কর্মসূচিতে অনেক সময় অনেক কিছু যোগ-বিয়োগ হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী নিউইয়র্কের কর্মসূচি শেষে ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে দেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার।
পররাষ্ট্র সচিব আশা প্রকাশ করেন, এই সফরের মাধ্যমে নতুন সরকারের নতুন যাত্রা বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। তাঁর ভাষায়, এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকে একটি গণতান্ত্রিক, আত্মবিশ্বাসী, দায়িত্বশীল, শান্তিপ্রিয় ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের বার্তা দিতে চায় সরকার।