লোকগান ও জারি-সারি গানের মধ্য দিয়ে শুরু, এরপর শত শত বৈঠার ছন্দে নৌকার দৌড়- মাদারীপুরের রাজৈরে বাঘিয়ার বিল যেন পরিণত হয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী উৎসবের মঞ্চে। প্রায় চারশ বছরের পুরোনো নৌকাবাইচ দেখতে বিলের দুই পাশে ও নৌকায় ভিড় করেন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী হাজারো মানুষ।
রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়নের পাখুল্লা গ্রামের বাঘিয়ার বিলে এ আয়োজন করা হয়। শুরুতে ভাসমান নৌকায় হারমোনিয়াম, ঢোলসহ নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে লোকসংগীত ও জারি-সারি গান পরিবেশন করেন শিল্পীরা। গান শেষে শত শত নৌকা নিয়ে বিলে জড়ো হন দর্শনার্থীরা। এরপর প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শুরু হয় ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। বৈঠার তালে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকাগুলো ছুটে চলতে থাকলে দর্শকদের মধ্যেও তৈরি হয় ব্যাপক উচ্ছ্বাস। কখনো কোনো নৌকা এগিয়ে গেলে করতালি ও আনন্দে মেতে ওঠেন দর্শকরা, আবার প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা পিছিয়ে পড়লে দেখা যায় হতাশাও। বিলের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে অবস্থান নেওয়া শত শত নৌকা থেকেও প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন তারা।
এবারের প্রতিযোগিতায় ১০টির বেশি নৌকা অংশ নেয়। নৌকার গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের করতালি ও উৎসাহও বাড়তে থাকে। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মধ্যে ফ্রিজ, পাঁচটি এলইডি টিভি ও পাঁচটি মোবাইল ফোন পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয়।
নৌকাবাইচের উদ্যোক্তা সমির বালা বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় নৌকাবাইচে প্রতিযোগী হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি বহুবার প্রথম পুরস্কার অর্জন করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নিজ গ্রামে প্রতিবছর এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি নিজেও জারি-সারি গানের শিল্পী। তাই অন্য কোথাও জারি-সারি গানের আয়োজন না থাকলেও নিজেদের এলাকায় জারি-সারি ও ভাটিয়ালি গান দিয়ে নৌকাবাইচের উদ্বোধন করা হয়।
বাইক্কার বিল নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা আয়োজক কমিটির সভাপতি জৌতিশ হালদার বলেন, নৌকাবাইচ আবহমান বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসা এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে এমন আয়োজন করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও নৌকাবাইচের প্রতি আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এই আয়োজনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার প্রত্যাশা রয়েছে।
তিনি জানান, পাখুল্লা সিরাজকাঠি যুবসমাজের উদ্যোগে গত পাঁচ বছর ধরে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই তিনি তার ঠাকুরদাদার সময় থেকে নৌকাবাইচ দেখে আসছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ নৌকাবাইচের ঐতিহ্য প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো। বর্তমানে স্থানীয় যুবসমাজ সেই ঐতিহ্য ও স্মৃতি ধরে রাখার কাজ করছে।