জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে সাগরে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ শিকারে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পরেছেন দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলের জেলেরা। হঠাৎ তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আলিপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দর থেকে সাগরে যাওয়া শত শত মাছ ধরার ট্রলারের জ্বালানি খরচ বেড়েছে। এতে দুশ্চিন্তায় পরেছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আলিপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দর ঘুরে জেলে, ট্রলার মালিক ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্রমতে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য অবতরণকেন্দ্র আলিপুর ও মহিপুর। এ বন্দর থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রলার বঙ্গোপসাগরে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ শিকারে যায়। সাগরে যাওয়ার আগে প্রতিটি ট্রলারে প্রয়োজন অনুযায়ী হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল মজুত করতে হয়। কয়েকদিন থেকে শুরু করে দীর্ঘসময় সাগরে অবস্থান করায় ট্রলার পরিচালনায় জ্বালানি খরচই অন্যতম বড় ব্যয়।
জেলেরা জানিয়েছেন, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে জ্বালানি তেলের পাশাপাশি বরফ, খাবার, পানি, জাল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ক্রয় করতে হয়। এর সাথে রয়েছে মাঝি ও জেলেদের মজুরি। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মাছ ধরার শুরুতেই বাড়তি খরচ যোগ হচ্ছে। পাশাপাশি সাগরে প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ না পেলে কিংবা বাজারে মাছের দাম কম থাকলে লোকসানের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলে আব্দুল কলিম মাঝি সাগরে নিয়মিত মাছ ধরেন তিনি বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গেলে একটি ট্রলারে বিপুল পরিমাণ তেল লাগে। তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সাগরে যাওয়ার আগেই আমাদের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। মাছ ভালো না পেলে এই বাড়তি খরচ তুলে আনা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে আমরা এখন চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছি।
মৎস্য ব্যবসায়ী লোকমান হোসেন বলেন, আলিপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দর থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রলার সাগরে মাছ ধরতে যায়। প্রতিটি ট্রলারে হাজার হাজার লিটার জ্বালানি তেল প্রয়োজন হয়। তেলের দাম বাড়ায় মাছ আহরণের খরচও বেড়ে গেছে। এর প্রভাব মাছের বাজারদর এবং জেলে ও ব্যবসায়ীদের ওপর পড়ছে। ট্রলার মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সাগরে মাছ ধরার অভিযানে জ্বালানি খরচ বড় ব্যয়। তেলের দাম বাড়ায় একটি ট্রলার সাগরে পাঠাতেই আগের তুলনায় বেশি মূলধন প্রয়োজন হচ্ছে। মাছ আহরণ কম হলে অথবা কাঙ্খিত দামে বিক্রি করা সম্ভব না হলে, বাড়তি ব্যয়ের কারণে লোকসানের ঝুঁকিও বাড়বে। মহিপুরের এফবি সাইমুন ট্রলারের মালিক রেজাউল মাতুব্বর বলেন, আগে ২০০ লিটারের এক ব্যারেল জ্বালানি তেলের দাম ছিল ২৩ হাজার ৫০০ টাকা, এখন তা কিনতে ২৭ হাজার ৫০০ টাকা লাগছে। একটি ট্রলারে সাগরে যেতে প্রায় চার ব্যারেল তেল প্রয়োজন হয়। শুধু জ্বালানি তেলেই এখন বাড়তি প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ সাগরে আগের তুলনায় মাছও কম পাওয়া যাচ্ছে। আগে কিছু টাকা সঞ্চয় থাকতো, এখন সেটাও নেই। এর সঙ্গে স্টাফের বেতন, জাল, বরফ, খাবারসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে। এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে মাছ কম পাওয়ার মৌসুমে ট্রলার চালানো আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
কুয়াকাটা ঝাউবন এলাকার জেলে নুরুল হক বলেন, প্রতিবছর সাগরে মাছ ধরতে নামার আগে একটি ট্রলারে দুই থেকে তিন লাখ টাকার জাল, দড়ি, বরফসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয় করতে হয়। এরসাথে দিন দিন জ্বালানি তেলের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। মাছের দাম বা আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এখন আমাদের চিন্তা, ট্রলারের জন্য তেল কিনবো, নাকি সেই টাকা দিয়ে সংসার চালাবো? এভাবে খরচ বাড়তে থাকলে সংসার চালাবো কীভাবে?’
মহিপুরের মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির সভাপতি রাজু আহম্মেদ রাজা বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু জেলে ও ট্রলার মালিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মাছ আহরণ থেকে শুরু করে ঘাটে আনা, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ, পুরো মৎস্য সরবরাহ ব্যবস্থায় এর প্রভাব পরছে। শেষপর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ে মাছের দামেও পড়ছে।
কুয়াকাটা মেয়র বাজারের ক্রেতা রেদওয়ানুল ইসলাম রাসেল বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অযুহাতে মাছের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেকারণে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা সাধারণ পরিবারের মানুষ। প্রতিবছর অন্তত বর্ষার সময়ে ইলিশ মাছ ক্রয় করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু এবছর একদিকে ইলিশের আকার তুলনামূলক ছোট, অন্যদিকে দাম আকাশচুম্বী। আবার জেলেরাও প্রত্যাশিত পরিমাণ মাছ পাচ্ছেন না। সবমিলিয়ে মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে আমাদের রিজিক থেকে ইলিশ উঠে যাচ্ছে।