খাস জমি হারালে থমকে যাবে কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ উন্নয়ন

বাড়বে উন্নয়ন ব্যয়, সংকুচিত হবে পর্যটন ও পরিবেশ সুরক্ষার জায়গা

এফএনএস (কুয়াকাটা, পটুয়াখালী) : | প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম
বাড়বে উন্নয়ন ব্যয়, সংকুচিত হবে পর্যটন ও পরিবেশ সুরক্ষার জায়গা

সমুদ্রসৈকত, ম্যানগ্রোভ বন, খাল, জলাভূমি ও পর্যটন অবকাঠামোকে ঘিরে কুয়াকাটাকে পরিকল্পিত পর্যটননগর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই সরকারি খাস জমি, জলাভূমি, খাল, প্লাবনভূমি ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল জমি সঠিকভাবে চিহ্নিত ও সুরক্ষিত করা না গেলে ভবিষ্যতের উন্নয়নই জমির সংকটে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ পরিকল্পিত নগর গড়তে শুধু হোটেল-রিসোর্টের জায়গা নয়, প্রয়োজন সড়ক, ড্রেনেজ, জলাধার, পার্ক, উন্মুক্ত স্থান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটন সুবিধা ও দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামোর জন্যও পর্যাপ্ত সরকারি জমি।

কুয়াকাটাকে ঘিরে চধুৎধ-কঁধশধঃধ ঈড়সঢ়ৎবযবহংরাব চষধহ (চকঈচ)-এ ভূমি ব্যবহারের বিভিন্ন শ্রেণি নির্ধারণের কাঠামো রয়েছে। পর্যটন, আবাসিক এলাকা, পরিবহন, জলাশয়, উপকূলীয় এলাকা ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল ভূমিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ কুয়াকাটার উন্নয়ন হবে কোথায় স্থাপনা হবে, আর কোথায় স্থাপনা হবে না-এই দুইয়ের সমন্বয়ে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর বড় চ্যালেঞ্জ সরকারি খাস জমির সঠিক হিসাব ও দখল পরিস্থিতি। ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কুয়াকাটার সরকারি খাস জমি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। কলাপাড়া ভূমি কার্যালয়ের সূত্রে বলা হয়েছে, কাউয়ারচর মৌজায় ৩০০ একরের বেশি সরকারি খাসজমি রয়েছে। ওই প্রতিবেদনে সরকারি খাসজমিতে বিভিন্ন আবাসন প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড স্থাপনের কথাও উঠে এসেছে। 

আরেক প্রতিবেদনে কুয়াকাটায় প্রায় ২ হাজার একর খাস জমি ব্যক্তির নামে রেকর্ড হওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। ভূমি জরিপের বিভিন্ন ধাপ, পুরোনো বন্দোবস্ত, কথিত ‘লুজ খতিয়ান’, ভূমি উন্নয়ন করের রশিদ এবং দখল-বিক্রির মাধ্যমে সরকারি জমি ব্যক্তি মালিকানায় চলে যাওয়ার অভিযোগও সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়গুলো অভিযোগের পর্যায়ে থাকায় এগুলো যাচাই করে চূড়ান্ত ভূমি-রেকর্ড নির্ধারণ করা জরুরি।

এই বাস্তবতা কুয়াকাটার ল্যান্ড জোনিংয়ের জন্য বড় সতর্কবার্তা। যে জমি ভবিষ্যতে সরকারি সড়ক, পর্যটন পার্ক, ড্রেনেজ, জলাধার কিংবা উন্মুক্ত স্থান হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে, সেটি যদি এরই মধ্যে দখল বা বিতর্কিত মালিকানায় চলে যায়, তাহলে পরিকল্পনা কাগজেই আটকে যেতে পারে।

সরকারি নিয়মেও পৌর এলাকার খাস জমির তালিকা তৈরি করে জমির ব্যবহারযোগ্যতা অনুযায়ী আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প বা অন্য কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনা উল্লেখ এবং ভবিষ্যতে সরকারি ও জনকল্যাণমূলক কাজে প্রয়োজন হতে পারে-এমন জমি চিহ্নিত করার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেও খাস ও অন্যান্য সরকারি সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূমি থেকে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং খাসজমি পুনরুদ্ধারের বিষয়টি স্পষ্টভাবে রয়েছে। উপজেলা ভূমি প্রশাসনের দায়িত্বের মধ্যেও খাসজমি চিহ্নিতকরণ, উদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ ও খাস তালিকা হালনাগাদের বিষয় উল্লেখ আছে। খাস জমি হারানোর দ্বিতীয় বড় প্রভাব পড়তে পারে পানি নিষ্কাশনে। 

কুয়াকাটা নিম্নাঞ্চল ও জোয়ার-ভাটাপ্রবণ হওয়ায় খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের জায়গা দখল বা ভরাট হয়ে গেলে ভবিষ্যৎ নগরায়ণের সঙ্গে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়বে। পরিকল্পিত সড়ক ও স্থাপনা নির্মাণ হলেও যদি পানি যাওয়ার প্রাকৃতিক পথ না থাকে, তাহলে উন্নয়ন মানুষের দুর্ভোগ কমানোর বদলে নতুন সমস্যা তৈরি করতে পারে। খাস জমি দ্রুত চিহ্নিত না হলে সরকারকে ভবিষ্যতে নিজের প্রয়োজনের জমিই কিনতে হতে পারে। আজ যে জমি সরকারি মালিকানায় আছে, সেটি যদি দখল, অবৈধ বন্দোবস্ত বা বিতর্কিত রেকর্ডের কারণে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, পরে রাস্তা, পার্ক, ড্রেনেজ বা পর্যটন সুবিধা নির্মাণে অধিগ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে প্রকল্প ব্যয় বাড়বে এবং মামলা-মোকদ্দমায় বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

সবচেয়ে বড় বিষয়, কুয়াকাটার পর্যটন অর্থনীতি তার প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গামতির ম্যানগ্রোভ বন, সৈকতসংলগ্ন বাফার এলাকা, খাল, জলাভূমি ও উন্মুক্ত ভূমি কমে গেলে পর্যটননগরীর পরিবেশগত ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে। ফলে এখনই সরকারি খাস জমি, বনভূমি, জলাভূমি ও অন্যান্য সংবেদনশীল ভূমিকে একই মানচিত্রে এনে সীমানা নির্ধারণ করা জরুরি। এ জন্য কুয়াকাটায় শুধু ল্যান্ড জোনিং করলেই হবে না; প্রয়োজন ‘জোনিং ম্যাপের সঙ্গে খাস জমির দাগ-খতিয়ান মিলিয়ে মাঠে সীমানা দৃশ্যমান করা’। কোন জমি সরকারের, কোনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন, কোনটি বনভূমি, কোনটি জলাশয় এবং কোন এলাকায় ভবিষ্যতে নির্মাণ করা যাবে না-এসব তথ্য একীভূত করা গেলে দখল ও মালিকানা নিয়ে বিরোধও কমবে। কুয়াকাটার সামনে তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন-কোথায় উন্নয়ন হবে, তার আগে কোথায় সরকারি জমি আছে তা কি নিশ্চিত করা হয়েছে? খাস জমি দ্রুত চিহ্নিত, রেকর্ড যাচাই, সীমানা নির্ধারণ ও অবৈধ দখলমুক্ত করা না গেলে ভবিষ্যতের পরিকল্পিত কুয়াকাটা প্রয়োজনীয় জমির অভাবে সংকুচিত হতে পারে। তখন পরিকল্পনা থাকবে, বিনিয়োগও থাকবে; কিন্তু সড়ক, ড্রেনেজ, পার্ক, পর্যটন সুবিধা ও পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কুয়াকাটার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জমি তাই আজই সুরক্ষিত করার সময়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে