চট্টগ্রামের পাহাড়তলী সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে ঘুস নেওয়ার সময় একজন সাব-রেজিস্ট্রারসহ তিনজনকে হাতেনাতে আটকের ঘটনা একটি পুরোনো বাস্তবতাকে আবার সামনে এনেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযোগ অনুযায়ী দলিলে কোনো ত্রুটি না থাকা সত্ত্বেও সেবা প্রদানের প্রক্রিয়া আটকে রেখে অর্থ দাবি করা হয়েছিল। অর্থাৎ ঘুস এখানে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পাওয়ার উপায় নয়; বরং নাগরিককে তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে অর্থ আদায়ের একটি কৌশল। এটি শুধু দুর্নীতি নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারও বটে। একজন সাধারণ মানুষ যখন নিজের বৈধ কাজ সম্পন্ন করতে ঘুস দিতে বাধ্য হন, তখন তিনি শুধু আর্থিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর বিশ্বাসও ক্ষয়ে যায়। সমপ্রতি প্রযুক্তিনির্ভর একটি নাগরিক উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি সেবা খাতে ঘুস দাবির যে বিপুল অভিযোগ সামনে এসেছে, তাও একই সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এতে বোঝা যায়, সমস্যাটি কোনো একক দপ্তর বা বিচ্ছিন্ন কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি অসুস্থ সংস্কৃতি বিভিন্ন খাতে শেকড় গেড়েছে। ভূমি, রেজিস্ট্রি, পাসপোর্ট কিংবা অন্যান্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষকে প্রায়ই অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। ফলে দুর্নীতি ধীরে ধীরে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। তবে শুধু অভিযানে কয়েকজনকে আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রশ্ন হলো, কী কারণে একজন কর্মকর্তা এমন সাহস পান যে প্রকাশ্যে ঘুস দাবি করতে পারেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে জবাবদিহির ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার সংস্কৃতির কথা সামনে আসে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযান প্রশংসনীয়, কিন্তু এর পাশাপাশি প্রতিটি দপ্তরে অভ্যন্তরীণ নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সেবার পুরো প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে, যাতে কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতার সরাসরি যোগাযোগ কমে আসে। আমরা মনে করি, ঘুসবিরোধী লড়াইকে বিচ্ছিন্ন অভিযাননির্ভর না রেখে একটি জাতীয় সংস্কার কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, দ্রুত তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করতে হবে এবং অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। কারণ দুর্নীতি শুধু অর্থের অপচয় ঘটায় না, এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার ভিত্তিকেও ধ্বংস করে। একটি জবাবদিহিমূলক ও সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য ঘুসের এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ও আপসহীন অবস্থান নেওয়া জরুরি।