বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা। একই সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সুশাসন, জলবায়ু, টেকসই উন্নয়ন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমে সহযোগিতা আরও জোরদারের কথা জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে রাষ্ট্রদূতরা এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় তারা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানান। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যেও মির্জা ফখরুলের ২১ আগস্ট ২০২৬ দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
সাক্ষাতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার উপস্থিত ছিলেন। মাইকেল মিলার বর্তমানে বাংলাদেশে ইইউ রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অভিনন্দনের জন্য ইইউ রাষ্ট্রদূতদের ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় দেশগুলোর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশ ও ইউরোপের অংশীদারত্ব এখন বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণে ইইউ এবং এর সদস্য দেশগুলোর অব্যাহত সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও গভীর করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশে ইউরোপীয় বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর আহ্বানও জানান রাষ্ট্রপতি। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সমান সুযোগ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
অভিবাসন প্রসঙ্গে অবৈধ অভিবাসন ও মানব পাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির জন্য বৈধ অভিবাসনের সুযোগ আরও বাড়াতে এবং আরও ইইউ সদস্যরাষ্ট্রকে ‘ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ’ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য বাংলাদেশ-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও এর আগে আলোচনা হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বৈঠকেও দুই পক্ষ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও গভীর করা এবং এফটিএ নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে মতবিনিময় করেছে।
বঙ্গভবনের বৈঠকে ইইউ রাষ্ট্রদূতরা পারস্পরিক আস্থা, বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্ব আরও জোরদারে বর্তমান সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা বাণিজ্য, সুশাসন, জলবায়ু কার্যক্রম ও টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক, বিচার বিভাগীয় এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগেও অব্যাহত সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতার কথা জানান তারা। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বহুপাক্ষিকতা, আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমুন্নত রাখতে এবং বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটও গুরুত্ব পায়। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ইইউর অব্যাহত ও বর্ধিত মানবিক সহায়তা কামনা করেন রাষ্ট্রপতি। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে ইইউকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রদূতরা এ বিষয়ে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানান।
এ ছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ রূপান্তর, অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, সামুদ্রিক বিষয়াবলি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়েও মতবিনিময় হয়।
সাক্ষাতে উপস্থিত ছিলেন ইইউ প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে, জার্মানির রাষ্ট্রদূত রুডিগার লৎস, ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইউরিছ ভান বোসেল, স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল মারিয়া সিসতিয়াগা ওচহোয়া ডি চিনচিত্রু এবং সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইক্স।
এ ছাড়া রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব, সচিব, প্রেস সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকও উপস্থিত ছিলেন।