কৃষকের মাঠে ফসলের হাসি ফোটাতে দিনরাত ছুটে চলেন তারা। কখনো কাদামাটি মাড়িয়ে,কখনো রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে পৌঁছে দেন কৃষকের দোরগোড়ায়। কৃষকের জমি পরিদর্শন,সরকারি প্রনোদনা বিতরণ কিংবা কৃষি বিভাগের নানা কর্মসূচি-সবখানেই তাদের হাতে থাকে গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে। কিন্তু কৃষির সেই চাকা সচল রাখা মানুষগুলোর নিজেদের সংসারের চাকা যেন থমকে গেছে। এক মাস নয়,দুই মাস নয় একটানা প্রায় এক বছর ধরে বেতন পাচ্ছেন না ঝিনাইদহের বিভিন্ন উপজেলা কৃষি অফিসে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া গাড়ি চালকেরা।কাজ করছেন নিয়মিত,কিন্তু মাস শেষে মিলছে না তাদের পরিশ্রমিক।
ঝিনাইদহ সদর,মহেশপুর,শৈলকুপা,কোটচাঁদপুর ও হরিণাকুন্ডু উপজেলায় আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গাড়ি চালকরা এমন সংকটে রয়েছেন।তাদেরই একজন আব্দুর রাজ্জাক। ২০১৩ সালের ফেবব্রুয়ারিতে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কৃষি অফিসের গাড়িচালক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। শুরুতে একটি প্রকল্পের আওতায় বেতন পেতেন। চাকরি জীবনে বিভিন্ন সময় বেতন পেতে দেরি হয়েছে,এমনকি বেতন বন্ধ থাকার ঘটনাও ঘটেছে। তবে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত টানা বেতন বন্ধ।আব্দুর রাজ্জাকের ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পোড়াহাটি ইউনিয়নের ধানহাড়িয়া-চুয়াডাঙ্গা গ্রামে।তিনি বর্তমানে ঝিনাইদহ সদর উপজেলা কৃষি অফিসারের গাড়ি চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।দুই সন্তান নিয়ে তার সংসার। পঞ্চম শ্রেনীতে পড়া একটি মেয়ে আর মাত্র ১৬ মাস বয়সী একটি ছেলে। সংসারের আয় বলতে এখন স্ত্রীর দর্জির কাজ থেকে পাওয়া সামান্য অর্থ।বেতন বন্ধ থাকার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপুত হয়ে পড়েন আব্দুর রাজ্জাক।
তিনি বলেন, ২০১৩ সাল থেকে চাকরি করছি। এত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছি। বেতন দেরি হয়েছে,বেতন বন্ধছিল তারপরও চাকরি ছেড়ে দিইনি। কারণ এই চাকরিটাই আমার পরিবারের ভরসা। কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে এক টাকাও বেতন পাইনি। প্রতিদিন অফিসের গাড়ি নিয়ে বের হই,কর্মকর্তাদের নিয়ে মাঠে যাই,কৃষকের কাছে যাই। অথচ নিজের সন্তানদের জন্য ঠিকমতো খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে দিতে পারি না।তিনি বলেন,আমার মেয়েটা পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে। তার স্কুলের খরচ আছে,পড়াশোনার খরচ আছে। ছোট ছেলেটার বয়স মাত্র ১৬ মাস। ওর জন্যও কত কিছু দরকার। মেয়েটা কিছু চাইলে অনেক সময় বলতে হয়-এখন না,পরে দেব। কিন্তু সেই 'পরে' আর আসে না। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?স্ত্রীর দর্জির কাজের কথা উল্লেখ করে আব্দুর রাজ্জাক বলেন,'আমার স্ত্রী সেলাইয়ের কাজ করে। ওই আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাচ্ছে। একদিকে বাজারের খরচ,অন্যদিকে সন্তানদের পড়াশোনা-সব মিলিয়ে খুব কষ্টে আছি। ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। মানুষের কাছে হাত পাততেও লজ্জা লাগে। আমরা তো কাজ করছি,আমাদের বেতনটা চাইছি; কারও দয়া চাইছি না।তার ভাষায়,সারাদিন অন্যের সংসারের কাজ সচল রাখতে গাড়ি চালাই। কৃষি কর্মকর্তারা মাঠে গেলে কৃষকের কাজ হয়,কৃষকের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে। কিন্তু দিন শেষে যখন নিজের ঘরে ফিরি, তখন মনে হয়-আমার সংসারের চাকা কেন চলছে না? গাড়ির চাকা থামলে ঠিক করা যায়,কিন্তু সংসারের চাকা থেমে গেলে সন্তানদের মুখের দিকে তাকানো খুব কঠিন।আব্দুর রাজ্জাক আরও বলেন,আমরা দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি। বেতন পাব-এই আশায় এতদিন ধরে কাজ করছি। এখন শুধু চাই,আমাদের বেতন চালু করে বকেয়া বেতন গুলো পরিশোধ করা হোক। শুধু আব্দুর রাজ্জাক নন,জেলার অন্য উপজেলা কৃষি অফিসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গাড়ি চালকদের একই ধরনের অভিযোগ। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় কেউ দোকানে বাকি করছেন,কেউ স্বজনের কাছ থেকে ধার করছেন,আবার কেউ পরিবারের খরচ মেটাতে বিকল্প আয়ের পথ খুঁজছেন।গাড়ি চালকেরা জানান,উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন কর্মসূচি,কৃষকের জমি পরিদর্শন, সরকারি প্রনোদনা বিতরণ এবং কৃষি কার্যক্রম বাস্তবায়নে নিয়মিত তাদের গাড়ি চালাতে হয়। সরকারি দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি না থাকলেও বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।
শৈলকুপা উপজেলা কৃষি অফিসারের চালক শফিকুল ইসলাম বলেন,বেতন না পাওয়ায় দোকানে বাকি হয়েছে,মানুষের কাছ থেকে ধার করতে হয়েছে। সন্তানদের প্রয়োজন মেটাতে না পারলে একজন বাবার যে কষ্ট হয়,সেটা ভাষায় বলা যায় না। অফিসের গাড়ি ঠিকমতো চলার জন্য যেমন জ্বালানি লাগে,আমাদের সংসার চালাতেও তো টাকার প্রয়োজন। আমরা কাজ করছি,তাই আমাদের প্রাপ্য বেতনটুকু সময়মতো পাওয়াই আমাদের দাবি।আমরা কারও কাছে সাহায্য চাই না। শুধু চাই,যে কাজ করছি তার ন্যায্য পপারিশ্রমিক যেন পাই এবং দীর্ঘদিনের বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ করা হয়।
এ বিষয়ে ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন,'আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া গাড়ি চালকদের বেতন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় তারা অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তারা খুবই নিম্নআয়ের মানুষ। মাসের পর মাস বেতন না পাওয়ায় তাদের সংসার চালানো,সন্তানদের পড়াশোনার খরচ,নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা-সবকিছুই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই তাদের কষ্ট আমাদের চোখের সামনে দেখতে হচ্ছে। একজন মানুষ সারাদিন দায়িত্ব পালন করার পরও যদি মাস শেষে তার পারিশ্রমিক না পান,তাহলে তার পরিবারের ওপর কী ধরনের চাপ পড়ে,সেটা সত্যিই বেদনাদায়ক। আমরা বিষয়টি নিয়ে নিজেরাও উদ্বিগ্ন। দ্রুত তাদের বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা হলে এই অসহায় মানুষগুলোর পরিবারে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে।