একটি পরিত্যক্ত কুয়া। গভীরতা প্রায় ৯ ফুট। সেই অন্ধকার কুয়ার তলদেশে তিন দিন ধরে আটকে ছিল একটি দাঁড়াশ সাপ। ওপরে ওঠার কোনো পথ নেই, চারদিকে দেয়াল-বেঁচে থাকার জন্য যেন এক অনিশ্চিত অপেক্ষা।
শেষ পর্যন্ত সেই বন্দিদশার অবসান হলো। তবে সাপটিকে উদ্ধারের জন্য যেতে হলো এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জের বাহুবলে ছুটে গেল বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের উদ্ধারকারী দল। প্রায় ৩০ মিনিটের ঝুঁকিপূর্ণ চেষ্টায় ৯ ফুট গভীর কুয়ার ভেতর থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হলো দাঁড়াশটিকে। শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুর ৩টার দিকে ঘটনাটি ঘটে হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল উপজেলার দক্ষিণ রামপুর চা বাগান (রাধানগর) এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দা সজল সাওতালের বাড়ির একটি পরিত্যক্ত কুয়ায় প্রায় ৯ ফুট গভীরে সাপটি আটকে ছিল। স্থানীয়দের ধারণা, প্রায় তিন দিন ধরে সাপটি ওই কুয়ার মধ্যে আটকে ছিল। বিষয়টি জানার পর সাপটিকে কীভাবে নিরাপদে উদ্ধার করা যায়, তা নিয়ে স্থানীয়ভাবে চেষ্টা করা হলেও সহজ কোনো উপায় মিলছিল না। পরে জীবন চাষা অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের যোগাযোগ নম্বর সংগ্রহ করে বিষয়টি ফাউন্ডেশনকে জানান।
খবর পেয়েই দেরি না করে শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জের বাহুবলের উদ্দেশে রওনা হন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ। ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা কুয়ার ভেতরে তাকিয়ে নিশ্চিত হন-সেখানে একটি দাঁড়াশ সাপ আটকে রয়েছে।
কিন্তু উদ্ধার করা মোটেই সহজ ছিল না। প্রায় ৯ ফুট গভীর কুয়ার ভেতরে নামার জন্য একটি মই ব্যবহার করা হয়। এরপর শুরু হয় অন্ধকার ও সংকীর্ণ কুয়ার ভেতরে উদ্ধার অভিযান। প্রায় ৩০ মিনিটের চেষ্টার পর অবশেষে সফল হন উদ্ধারকারীরা। কুয়ার গভীর তলদেশ থেকে দাঁড়াশ সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে ওপরে নিয়ে আসা হয়। উদ্ধারের পর সাপটিকে শ্রীমঙ্গল বন্যপ্রাণী বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
বন্যপ্রাণী উদ্ধারের ক্ষেত্রে ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে এ কারণে যে, বিপদে পড়া প্রাণীটি ছিল হবিগঞ্জের বাহুবলে, অথচ উদ্ধারের জন্য এগিয়ে এসেছে পাশের জেলা মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি স্বেচ্ছাসেবী বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দল। শ্রীমঙ্গলভিত্তিক বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে লোকালয়ে আটকে পড়া, আহত কিংবা অসুস্থ বন্যপ্রাণী উদ্ধারে কাজ করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়েও প্রতিষ্ঠানটির সদস্যরা শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে অজগর, সাপ, বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বন্যপ্রাণী বিভাগের কাছে হস্তান্তর করেছেন।
ফাউন্ডেশনের এই ধরনের কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য শুধু প্রাণী উদ্ধার নয়; মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমানো এবং আতঙ্কিত হয়ে প্রাণী হত্যা বন্ধে সচেতনতা তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। দাঁড়াশ সাধারণত মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। লোকালয়ে কোনো সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে হত্যা না করে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বন্যপ্রাণী বিভাগ বা অভিজ্ঞ বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকেও মানুষকে অনুরোধ করা হয়েছে-কোনো পশুপাখি ধরা পড়লে, আহত বা অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া গেলে নিজেরা ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত নিকটস্থ বন্যপ্রাণী বিভাগকে খবর দিতে হবে অথবা বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। একটি পরিত্যক্ত কুয়ার অন্ধকারে তিন দিন আটকে থাকা দাঁড়াশটির জন্য শনিবারের বিকেলটি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল মুক্তির বিকেল। আর সেই মুক্তির গল্পে সীমান্তঘেঁষা দুই জেলার মানুষ ও বন্যপ্রাণীপ্রেমীদের এক সুতোয় বেঁধে দিল শ্রীমঙ্গল থেকে ছুটে যাওয়া একটি ছোট্ট উদ্ধারকারী দল।