ভুল রেকর্ডে ভোগান্তি, ডিজিটাল জরিপের অপেক্ষায় লাখো ভূমি মালিক

এফএনএস ( মো: রাজিবুল ইসলাম রক্তিম; বগুড়া) : | প্রকাশ: ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৩৭ পিএম
ভুল রেকর্ডে ভোগান্তি, ডিজিটাল জরিপের অপেক্ষায় লাখো ভূমি মালিক

বগুড়া অঞ্চলে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শুরু হওয়া ভূমি জরিপের চার দশক পেরিয়ে গেলেও এখনো শেষ হয়নি এর জটিলতা। জরিপে ভুল, অনিয়ম ও অসংগতির অভিযোগের কারণে বছরের পর বছর ভোগান্তি পোহাচ্ছেন ভূমিমালিকরা। এদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ কার্যক্রম এগিয়ে গেলেও বগুড়া অঞ্চলে এখনো সেই কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় আধুনিক ভূমিসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লাখ লাখ জমির মালিক।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বগুড়া ও জয়পুরহাট জেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া অঞ্চলে ১৯৮৫ সালে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জরিপের নানা ভুল-ত্রুটি ও অভিযোগের নিষ্পত্তি এখনো শেষ হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় জরিপের মাঠপর্যায়ের কাজে চুক্তিভিত্তিক লোকজন নিয়োগ করা হয়েছিল। তাঁদের অনেকের কাজের যথাযথ তদারকি না হওয়ায় জরিপে নানা ধরনের অনিয়ম ও ভুলের সৃষ্টি হয়।

ভূমিমালিকদের অভিযোগ, ওই জরিপে নকশার সঙ্গে পর্চার মিল না থাকা, দাগ নম্বরে ভুল, জমির পরিমাণে অসঙ্গতি এবং এক ব্যক্তির জমি অন্য ব্যক্তির নামে রেকর্ড হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে চার দশক পরও নতুন করে অভিযোগ, সংশোধন ও আপত্তি নিয়ে সেটেলমেন্ট কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে জমির মালিকদের। এতে সময় ও অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ভূমি বিরোধ। বগুড়া সদর উপজেলার মালগ্রাম মৌজায় আরএস রেকর্ডের নতুন পর্চা প্রকাশের পর এমন অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, নতুন পর্চায় আকবর আলী মণ্ডলের ছেলে আব্দুল হালিম মণ্ডলের নামে ৬০টি দাগে মোট ৪ একর ১৭ শতাংশ জমি রেকর্ড করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই জমির মালিকানা দাবির পক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে কোনো দলিলের অস্তিত্ব নেই।

এদিকে বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার কোশাস গ্রামের মোহাম্মদ আলীর ছেলে ভূমিমালিক মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন ২০২২ সালের আগস্টে বগুড়ায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ চালুর দাবিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ৪০ বছর আগে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপ শুরু হলেও তা এখনো শেষ হয়নি। ফলে বগুড়া অঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে মৌজাগুলোকে ডিজিটাল জরিপের আওতায় আনার অনুরোধ জানান তিনি। একই দাবিতে বগুড়া সদর উপজেলার মালগ্রাম এলাকার আব্দুল মতিনের ছেলে আব্দুল বাতেনও ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। তাঁর আবেদনে বলা হয়, চার দশক আগে তৈরি নকশা ও বর্তমান বাস্তবতার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এ সময়ে অনেক কৃষিজমি, পুকুর, ঝোপঝাড় ও অন্যান্য খোলা জায়গায় বসতবাড়ি ও বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে পুরোনো নকশা অনুযায়ী জমির শ্রেণি ও ব্যবহার নির্ধারণ করা হলে ভবিষ্যতে সরকারি রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ বিষয়ে মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করলে ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইনানুগ সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে এরপরও মালগ্রাম মৌজায় প্রায় ৫৫ বিঘা জমি নিয়ে একটি বাটোয়ারা মামলায় ডিক্রিপ্রাপ্তদের নামে রেকর্ড না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে বগুড়া সেটেলমেন্ট জোনাল অফিসে ৪২ ধারায় ভুল ও বিতর্কিত রেকর্ড সংশোধনের জন্য দুই শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এছাড়া মালগ্রাম মৌজার ভুল রেকর্ড সংশোধন নিয়ে হাইকোর্টে দুটি রিট মামলাও চলমান রয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বিতর্কিত রেকর্ড গেজেট আকারে প্রকাশিত হলে পরবর্তী সময়ে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে আরও হাজার হাজার মামলা হতে পারে। একই সঙ্গে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থেকে সংঘাত, হানাহানি এমনকি গুরুতর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হতে পারে।

বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোছা. রওনক জাহান আগের জরিপে ব্যাপক ভুলের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, যারা জরিপের কাজে অংশ নিয়েছিলেন, তারা চুক্তিভিত্তিকভাবে কাজ করেছিলেন। আর যাদের ওপর তদারকির দায়িত্ব ছিল, তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করায় জরিপে ব্যাপক অনিয়ম ও ভুল রেকর্ড তৈরি হয়েছে। মালগ্রাম মৌজায় একই ব্যক্তির নামে ৬০টি দাগে ৪ একর ১৭ শতাংশ জমি রেকর্ড হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার বলেন, সে সময় হয়তো জরিপকারীরা প্রকৃত জমির মালিককে খুঁজে পাননি। এ কারণে পাশের জমির মালিকের নামে ওই জমি রেকর্ড হয়ে থাকতে পারে। তবে ওই ব্যক্তির ৬০টি দাগে জমি না থাকা সত্ত্বেও কীভাবে তাঁর নামে এত জমি রেকর্ড হলো, সে বিষয়ে সেটেলমেন্ট কার্যালয় থেকে কোনো তদন্ত করা হয়নি বলেও জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত মালিকরা অভিযোগ করলে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় জমি প্রকৃত মালিকের নামে রেকর্ড করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ভূমিমালিকদের দাবি, চার দশক আগের ভুল সংশোধনের পাশাপাশি বগুড়া অঞ্চলের সব মৌজাকে দ্রুত আধুনিক ডিজিটাল জরিপের আওতায় আনা জরুরি। এতে পুরোনো ভুল-ত্রুটি দূর হওয়ার পাশাপাশি ভূমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণ, রাজস্ব আদায় এবং দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ কমানো সম্ভব হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে