পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির মামলায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক চেয়ারম্যান ইকবালউদ্দিন চৌধুরীসহ আটজনকে মোট ১৪ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামিকে ১০ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড এবং দুর্নীতির অভিযোগে বরাদ্দ দেওয়া দুটি প্লট বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ঢাকার নবম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক আব্দুস সালাম এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য ছয় আসামি হলেন রাজউকের সাবেক সদস্য এস ডি ফয়েজ, এ কে এম ওয়াহেদুল ইসলাম, এস এম জাফর উল্লাহ, এইচ এম জহুরুল হক ও রেজাউল করিম তরফদার এবং ব্যবসায়ী শওকত আজিজ রাসেল ও আশফাক আজিজ রুবেল। তাঁরা পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত এম এ হাসেমের ছেলে। রাসেল আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং রুবেল পারটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০০১ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবরের মধ্যে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে বৈধ আবেদনকারীদের বঞ্চিত করেন। তাঁদের বিরুদ্ধে শওকত আজিজ রাসেল ও আশফাক আজিজ রুবেলকে পূর্বাচল প্রকল্পে ১০ কাঠা করে দুটি প্লট বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করার অভিযোগ আনা হয়।
দুদকের মামলার বিবরণে বলা হয়, দুই ভাই শিল্পপতি কোটায় প্লটের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে তাঁদের আবেদন অনুযায়ী বরাদ্দ না পাওয়ায় তাঁরা আবেদন প্রত্যাহার করে জামানতের টাকা তুলে নেন। এরপরও রাজউকের বিশেষ বোর্ড সভায় তাঁদের নামে প্লট বরাদ্দ অনুমোদনের অভিযোগ ওঠে। এ প্রক্রিয়ায় রাজউকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট বোর্ড সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, অনিয়মের মাধ্যমে দুই ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে গিয়ে অন্য বৈধ আবেদনকারীদের প্রাপ্য সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল। এ ঘটনায় প্লট বরাদ্দের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজউকের সাবেক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি দুই প্লটগ্রহীতাকেও আসামি করা হয়।
দুদকের কৌঁসুলি খন্দকার শামীম হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, আদালত অপরাধমূলক অসদাচরণের দায়ে আট আসামিকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দিয়েছেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাঁদের আরও এক বছর করে কারাভোগ করতে হবে।
এ ছাড়া অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে তাঁদের প্রত্যেককে আরও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রেও অর্থদণ্ড অনাদায়ে অতিরিক্ত এক বছর করে কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
তবে দুই ধারার কারাদণ্ড একসঙ্গে কার্যকর হবে বলে জানিয়েছেন দুদকের কৌঁসুলি। ফলে কারাদণ্ডের মেয়াদ যোগ করে ১৪ বছর হলেও তাঁদের মোট সাত বছর কারাভোগ করতে হবে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে অতিরিক্ত কারাভোগের বিষয়টি আদালতের আদেশ অনুযায়ী কার্যকর হবে।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী সাইফুল ইসলাম মিঠু জানান, আসামিরা জামিনে ছিলেন। তবে রায় ঘোষণার দিন তাঁরা আদালতে হাজির হননি। এ কারণে আদালত তাঁদের জামিন বাতিল করে সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগে ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলাটি করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎকালীন উপপরিচালক সিলভিয়া ফেরদৌস।
তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের তৎকালীন উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম। পরের বছর ২৬ আগস্ট আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন আদালত।
বিচার চলাকালে আদালত মামলায় নয়জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মঙ্গলবার রায় ঘোষণা করা হয়।
পূর্বাচল প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের এই মামলার রায়ে রাজউকের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দণ্ডিত করার পাশাপাশি বিতর্কিত বরাদ্দ বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায় কার্যকরের ক্ষেত্রে এখন আসামিদের গ্রেপ্তার এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।