দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ (টিভেট) ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ, কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সারা দেশে মানসম্মত প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা প্রসারে চীনের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়েছে বাংলাদেশ। বৈঠকে চীনা মানদণ্ডভিত্তিক ডিপ্লোমা ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন এবং সারা দেশে চীনা ভাষা শেখার সুযোগ সম্প্রসারণসহ শিক্ষা সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ৯টি ক্ষেত্রে দুই দেশ একমত হয়েছে।
চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড টেকনিক্যাল এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট কনফারেন্স ২০২৬’-এর সাইডলাইনে গতকাল রাতে বাংলাদেশের শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। অপরদিকে চীনা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির শিক্ষা উপমন্ত্রী রেন ইয়ৌছুন। বৈঠকে চীনের ভাষা শিক্ষা ও সহযোগিতা কেন্দ্রের মহাপরিচালক ইউ ইউনফেং, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বিনিময় বিভাগের উপমহাপরিচালক লিউ ইয়ং এবং কারিগরি ও প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা বিভাগের উপমহাপরিচালক চি ইয়ানওয়েই উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলন বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি দেশব্যাপী চীনা মানদণ্ড ভিত্তিক ডিপ্লোমা ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় চীনা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের কারিগরি ও অবকাঠামোগত সহযোগিতার আহ্বান জানান।
শিক্ষামন্ত্রী বৈঠকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- চীনা সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্মার্ট ক্লাসরুম স্থাপন, সকল কারিগরি কলেজে “চীনা ভাষা + কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন”বিশেষ কোর্স চালু এবং সারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চীনা ভাষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা।
চীনের শিক্ষা উপমন্ত্রী রেন ইয়ৌছুন শিক্ষামন্ত্রীর এসব প্রস্তাবের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন এবং বাংলাদেশের সামগ্রিক শিক্ষা কাঠামোর সার্বিক উন্নয়নে চীনের সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বাংলাদেশের টিভিইটি সংস্কার, স্মার্ট ক্লাসরুম নির্মাণ, কারিগরি প্রতিষ্ঠান আধুনিকায়ন এবং জাতীয় পর্যায়ে চীনা ভাষা শিক্ষা সম্প্রসারণে চীন সরকার পূর্ণ সহযোগিতা প্রদান করবে বলে পুনর্ব্যক্ত করেন। শিক্ষা সহযোগিতার ৯টি প্রধান ক্ষেত্র:
১. কারিগরি শিক্ষা, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় দক্ষতা সনদায়ন অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত ‘বাংলাদেশ-চীন যৌথ টিভিইটি দল’ গঠন করা হবে।
২. চীনের কারিগরি সহায়তা, আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা ও শিল্পখাতের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশে মডেল প্রদর্শনী (ডেমনস্ট্রেশন) টিভিইটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
৩. চীনা বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে বিদ্যমান কারিগরি কলেজসমূহের সার্বিক মান ও পদ্ধতিগত মূল্যায়ন করে উন্নয়ন ঘটানো হবে।
৪. চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশের কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সরাসরি শিল্প-শিক্ষা সংযোগ জোরদার করা হবে।
৫. প্রকৌশল, উৎপাদন, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা ও সেবাখাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশব্যাপী সমন্বিত “চীনা ভাষা + কারিগরি দক্ষতা”প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হবে।
৬. পেশাগত প্রশিক্ষণ, আনুষ্ঠানিক সনদ, শিল্পকারখানায় ইন্টার্নশিপ এবং টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে শিক্ষার্থী উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ তৈরি করা হবে
৭. বাংলাদেশি কারিগরি শিক্ষক ও শিক্ষা প্রশাসনে কর্মরতদের জন্য বার্ষিক শিক্ষক বিনিময় ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হবে।
৮. দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, একাডেমিক বিনিময় এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতা বহুগুণ সম্প্রসারণ করা হবে।
৯. গ্র্যাজুয়েটদের কর্মসংস্থান, প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সামগ্রিক সহযোগিতার প্রভাব মূল্যায়নের জন্য একটি আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হবে। বৈঠকে উভয় পক্ষই গৃহীত এই দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগসমূহ সময়মতো বাস্তবায়নের সুদৃঢ় অঙ্গীকার প্রকাশ করেছে।