বল হাতে এখনও কার্যকর, ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত উইকেটও নিচ্ছেন। ফিটনেস নিয়ে প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন মাঠের পারফরম্যান্সে। তবু ভারতের জাতীয় দলে জায়গা হচ্ছে না অভিজ্ঞ পেসার মোহাম্মদ শামির। নিউজিল্যান্ড সফরের জন্য ভারতের ওয়ানডে ও টেস্ট দল ঘোষণার পর আবারও সামনে এসেছে তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে প্রশ্ন। ৩৬ বছর বয়সী এই পেসারের জন্য কি জাতীয় দলের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নাকি নির্বাচকদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় আপাতত জায়গা নেই তাঁর?
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) নিউজিল্যান্ড সফরের জন্য দল ঘোষণা করে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। সফরে পাঁচটি ওয়ানডে ও দুটি টেস্ট খেলবে ভারত। টেস্ট দলে এক বছরেরও বেশি সময় পর ফিরেছেন পেসার আকাশ দীপ। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্স করেও দলে জায়গা পাননি শামি। টেস্ট দলের ১৬ জনের তালিকায় নেই তাঁর নাম। ওয়ানডে দলেও তাঁকে বিবেচনা করা হয়নি।
শামির প্রত্যাবর্তন নিয়ে কয়েক দিন ধরেই আলোচনা চলছিল। বিশেষ করে চার বছর পর ভারতের টি-টোয়েন্টি দলে ভুবনেশ্বর কুমারের প্রত্যাবর্তনের পর অনেকে আশা করেছিলেন, নির্বাচক কমিটিতে পরিবর্তনের প্রভাব শামির ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। কিন্তু প্রজ্ঞান ওঝার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচক কমিটি তাঁকে ফেরায়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সও জানিয়েছে, নিউজিল্যান্ড সফরের দুই টেস্টের দলে শামির জায়গা হয়নি।
সর্বশেষ কবে খেলেছেন ভারতের হয়ে
ভারতের হয়ে শামি সর্বশেষ খেলেছেন ২০২৫ সালের মার্চে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি সর্বশেষ ভারতের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলেন। টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর সর্বশেষ উপস্থিতি ২০২৩ সালের জুনে, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে।
এরপর চোট ও ফিটনেস নিয়ে নানা আলোচনার মধ্যে জাতীয় দলের বাইরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত খেলছেন এই পেসার। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
সাত ম্যাচে ৩৭ উইকেট
২০২৫-২৬ মৌসুমের রঞ্জি ট্রফিতে বাংলার হয়ে সাত ম্যাচে ৩৭ উইকেট নিয়েছিলেন শামি। তাঁর বোলিং গড় ছিল ১৬.৭২। ইনিংসে পাঁচ উইকেট পেয়েছেন তিনবার। চলতি মৌসুমের শুরুতেও নজর কেড়েছেন তিনি। বাংলার হয়ে দিল্লির বিপক্ষে রঞ্জি ট্রফির ম্যাচে পাঁচ উইকেট নেন এই পেসার।
এমন পারফরম্যান্সের পরও জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে শামির অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে ক্রিকেট মহলে।
ফিটনেস নিয়ে প্রশ্নের জবাব মাঠেই দিতে চান শামি
জাতীয় দলে শামির প্রত্যাবর্তনের পথে ফিটনেসকে বড় বিষয় হিসেবে দেখা হয়েছে। দীর্ঘদিন চোটের সমস্যায় ভোগার কারণে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলানোর মতো অবস্থায় তিনি পৌঁছেছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে শামি বারবার জানিয়েছেন, তিনি খেলার জন্য প্রস্তুত।
দিল্লির বিপক্ষে রঞ্জি ট্রফির ম্যাচের পর সাংবাদিকদের সামনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। শামি বলেন, “আপনারা আমার ফিটনেস দেখতে পাচ্ছেন। সেটা লিখুন। আপনারা তো আমাকে দেখছেন। আমি কী বললাম, তাতে কী হবে? আমি মাঠে আছি, খেলছি। যেখানে খেলার সুযোগ পাচ্ছি, সেখানেই খেলছি। আমার কাজ শুধু বোলিং করে যাওয়া।”
রঞ্জি ট্রফির শুরুর আগেও জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়া নিয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছিলেন এই পেসার। ভারতের হয়ে খেলতে না পারলেও তাঁর ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতি হচ্ছে না, এমন মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
বয়স কি বড় বাধা?
শামির বয়স এখন ৩৬ বছর। অভিজ্ঞতার দিক থেকে তিনি ভারতের অন্যতম পরিচিত পেসার। তবে দ্রুতগতির বোলারদের ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি চোটের ইতিহাস ও কাজের চাপ সামলানোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় ধরে বোলিং করতে হয়। টানা স্পেল করার ধকল সামলানোর পাশাপাশি পুরো সিরিজে ফিট থাকাও জরুরি। তাই দল নির্বাচনের সময় নির্বাচকেরা একজন পেসারের বর্তমান ফর্মের পাশাপাশি তাঁর শারীরিক অবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও বিবেচনায় নিতে পারেন।
শামির ক্ষেত্রে এসব বিষয় কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে নির্বাচকদের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে বয়স বা ফিটনেসকেই তাঁর বাদ পড়ার নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ভুবনেশ্বর ফিরলেন, শামি কেন নয়?
ভুবনেশ্বর কুমার ও শামির প্রত্যাবর্তনের পরিস্থিতিতে পার্থক্য রয়েছে। ভুবনেশ্বরকে বিবেচনা করা হচ্ছে সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে। অন্যদিকে শামিকে দলে নেওয়া হলে টেস্ট ও ওয়ানডে ক্রিকেটের জন্য বিবেচনা করতে হতো।
ভুবনেশ্বরের সাম্প্রতিক আইপিএল পারফরম্যান্সও তাঁকে আলোচনায় রেখেছে। গত দুই মৌসুমে তাঁর উইকেটসংখ্যা ছিল ৪৫। আইপিএলে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের কারণে নির্বাচকদের নজরে আসার সুযোগও তৈরি হয়েছে তাঁর।
অন্যদিকে ভারতের পেস আক্রমণে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। আকাশ দীপের মতো বোলাররা দলে জায়গা করে নিচ্ছেন। নিউজিল্যান্ড সফরের টেস্ট দলে জসপ্রীত বুমরাও ফিরেছেন। ফলে শামির জন্য শুধু ফিটনেস ও ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্স দেখানোই যথেষ্ট হচ্ছে না। নির্বাচকদের পরিকল্পনায় জায়গা পাওয়াও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
নিউজিল্যান্ড সফরে ভারতের টেস্ট দল
শুভমন গিল (অধিনায়ক), যশস্বী জয়সওয়াল, কে এল রাহুল (সহ-অধিনায়ক), দেবদত্ত পাড়িক্কল, ঋষভ পন্থ (উইকেটকিপার, ফিটনেস সাপেক্ষে), ধ্রুব জুরেল (উইকেটকিপার), রবীন্দ্র জাদেজা, অংশুল কম্বোজ, জসপ্রীত বুমরা, প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ, আকাশ দীপ, সাই সুদর্শন, নীতীশ কুমার রেড্ডি, ওয়াশিংটন সুন্দর, কুলদীপ যাদব ও মহম্মদ সিরাজ।
ভারত ও নিউজিল্যান্ডের প্রথম টেস্ট শুরু হবে ১৯ নভেম্বর ওয়েলিংটনে। দ্বিতীয় টেস্ট শুরু হবে ২৭ নভেম্বর ক্রাইস্টচার্চে। এর আগে ৪ নভেম্বর থেকে শুরু হবে পাঁচ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। প্রথম তিন ম্যাচে ভারতের নেতৃত্ব দেবেন শুভমন গিল, শেষ দুই ম্যাচে দায়িত্ব পালন করবেন শ্রেয়স আয়ার।
ওয়ানডে দলেও শামির জায়গা হয়নি। প্রথম তিন ম্যাচের দলে রয়েছেন রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, শ্রেয়স আয়ার, কে এল রাহুল, অক্ষর প্যাটেল, মহম্মদ সিরাজ, অর্শদীপ সিংহ ও কুলদীপ যাদবসহ অন্যরা। শেষ দুই ম্যাচের দলে পরিবর্তন এনে তিলক বর্মা, আকিব নবি, কুমার কুশাগ্র ও যশ ঠাকুরকে রাখা হয়েছে।
ঘরোয়া ক্রিকেটে শামির পারফরম্যান্স তাঁকে আলোচনায় রাখলেও জাতীয় দলে ফেরার বিষয়ে নির্বাচকদের কাছ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলেনি। তাই তাঁর জন্য ভারতের দলের দরজা চিরতরে বন্ধ কি না, তা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। তবে নিউজিল্যান্ড সফরে জায়গা না পাওয়ায় প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো এই অভিজ্ঞ পেসারের।